মানুষের বিভাজনের কৌশল: ইতিহাসের শিক্ষা
মানুষের বিভাজনের কৌশল: ইতিহাসের শিক্ষা

মানুষ চিতার মতো দ্রুত দৌড়াতে পারে না, গায়ের চামড়া নরম, ধারালো নখ বা তীক্ষ্ণ চঞ্চু নেই। সৃষ্টির দিক থেকে মানুষ অত্যন্ত নাজুক ও কোমল প্রাণী। অথচ এই মানুষই আজ পুরো পৃথিবীর অধিপতি, সৃষ্টির সেরা জীব। কীভাবে হলো এই অসম্ভবকে জয় করা? শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি মানুষের শারীরিক শক্তিতে ছিল না, তা ছিল মানুষের একতাবদ্ধ হওয়ার কৌশলে। হাজার হাজার বছর ধরে একে অন্যকে সাহায্য করার; জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর সম্পর্কের বন্ধনকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করার যে লিগ্যাসি, তা-ই মানুষকে শক্তিশালী করেছে। গল্প, ইতিহাস আর পারস্পরিক বিশ্বাসের গভীর শক্তিই আমাদের সভ্যতার মূল ভিত্তি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিভেদের কৌশল: কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার

কিন্তু আলোর সঙ্গে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি মানুষের এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে যুগে যুগে কিছু কুচক্রী মহলের উদ্ভব হয়েছে। এরা সাধারণ মানুষের মিলিত শক্তি, অর্থাৎ জাতিসত্তার 'বন্ধন'কে ভয় পায়। তাই তারা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে জনগণের মধ্যে বন্ধনের বদলে বিভেদের বিষ ঢুকিয়ে দিতে নানা কৌশল অবলম্বন করে। রাষ্ট্রের মধ্যে তারা যেভাবে কগনিটিভ অপারেশন চালায়: যুদ্ধ শুধু সীমান্ত বা মিসাইল দিয়ে হয় না; যুদ্ধ হয় মানুষের চিন্তাভাবনা আর মনস্তত্ত্ব নিয়ে, যাকে বলা হয় 'কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার'। এই যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হলো 'শব্দ' এবং 'মিডিয়া প্রচারণা'। বিভাজনকারীরা সাধারণ মানুষকে বলে না যে, তাদের মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে কী কী মিল রয়েছে, বরং তারা বারবার মনে করিয়ে দেয়, তাদের মধ্যে পার্থক্য ঠিক কী কী। তারা সমাজকে টুকরো টুকরো করার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে যেমন—'তুমি সাদা, ওরা কালো'; 'তুমি বাঙালি, ওরা পাহাড়ি'; 'তুমি এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, ওরা বহিরাগত'; 'তোমার নাক লম্বা ওদের নাক বোঁচা'; 'তুমি পক্ষের শক্তি ওরা বিপক্ষের শক্তি'; 'তুমি উচ্চবংশীয়, ওরা নিচুজাত'। যারা সামনে থেকে এই কথাগুলো বারবার উচ্চারণ করে তারা আসল প্লেয়ার নয়; এদের পেছনে কাজ করে এক শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এরা বিপুল অর্থ আর প্রযুক্তি দিয়ে এই শব্দগুলোকে বারবার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ে আসে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট', অর্থাৎ একটি কথা যদি বারবার, হাজার বার আপনার সামনে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়, শব্দটি যদি আপনার আবেগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় তবে আপনার অবচেতন মন একসময় সেটাকেই 'সত্য' বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ট্যাংক বা মিসাইল দিয়ে একটি দেশকে ধ্বংস করার চেয়ে এই কৌশল হাজার গুণ বেশি কার্যকর, কারণ এতে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ভেতর থেকেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

আদি বাসিন্দার বিতর্ক: কৃত্রিম বিভাজন

আজকাল প্রায়ই শোনা যায়— 'আমরাই এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, তাই এখানে শুধু আমরাই থাকব। অন্যদের কোনো অধিকার নেই।' বাহ্যিকভাবে এটিকে একটি যৌক্তিক রাজনৈতিক অধিকার মনে হতে পারে, কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই এর পেছনে থাকা কৌশল বের হয়ে আসে। তো, যিনি এমন দাবি করলেন যে তিনি ও তাদের গোষ্ঠী এই অঞ্চলের আদিবাসী, তাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ঠিক কত বছর এক অঞ্চলে বাস করলে একজন মানুষ 'আদি বাসিন্দা'র স্বীকৃতি পায়? সেই আদি বাসিন্দা হওয়ার আগে তাদের পূর্বপুরুষরা কোথায় ছিলেন? বিজ্ঞান ও নৃতত্ত্ব বলে, মানবজাতি এক এবং অভিন্ন পরিবারের অংশ। ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ীও সব মানুষ একই আদি পিতা-মাতা থেকে সৃষ্টি। তাহলে কে কোথায় আগে এলো, আর কে পরে, এই কৃত্রিম বিতর্ক কেন সৃষ্টি করা হচ্ছে? উত্তরটা পরিষ্কার—এসব কোনো অধিকারের লড়াই নয়, বরং শব্দের মারপ্যাচে জনগণের আবেগ নিয়ে খেলা করার কূটকৌশল। একদল মানুষকে অন্য দলের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ফায়দা লোটার এক নোংরা রাজনীতি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের শিক্ষা: রক্তের অক্ষরে লেখা কৃত্রিম বিভাজন

এই বাংলার মাটির একটা অদ্ভুত জাদু আছে। বহু শতাব্দী ধরে এই মাটির ধুলোবালি মেখে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টান সম্প্রদায় একই গ্রামে, পাশাপাশি পরম আত্মীয়ের মতো বসবাস করে এসেছে। 'সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই' কথাটি কোনো বইয়ের পাতা থেকে নয়, বরং বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছিল। এখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবকে নিজের মনে করত। ঈদের আনন্দ আর দুর্গাপূজার মণ্ডপ, নবান্নের উৎসব আর বড়দিনের আলো, সবই ছিল পাশাপাশি সংস্কৃতির অংশ। প্রতিবেশীর বিপদে কে হিন্দু আর কে মুসলিম, সেই হিসাব করার মানসিকতা কারো ছিল না; সমাজ গড়ে উঠেছিল এক অভেদ্য, নিটোল আত্মিক ও সামাজিক বন্ধনে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই ভাতৃত্ববোধ আর ঐক্যই কাল হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক এবং ক্ষমতার লোভী কিছু স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য। তারা বুঝতে পেরেছিল, যতদিন এই বিশাল জনসমষ্টি একতাবদ্ধ থাকবে, ততদিন তাদের ওপর শোষণ ও শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ফলে ব্যবহার করা হলো ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং ধূর্ত রাজনৈতিক ম্যাকেয়াভিলিয়ান নীতি, 'Devide and Rule', তথা 'ভাগ করো এবং শাসন করো'।

আদমশুমারি নীতি: বিভাজনের সূচনা

বাঙালিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিভক্ত করার প্রথম সুপরিকল্পিত চালটি ছিল ১৮৮১ সালের দিকে শুরু হওয়া ব্রিটিশদের 'আদমশুমারি নীতি'। এর আগে মানুষ নিজেকে বাঙালি বা গ্রামীণ পরিচয়ে প্রধানত চিনত। কে বড়, কে ছোট, কারা বেশি আর কারা কম এসব তাদের মনেও আসত না। কিন্তু ব্রিটিশরা খাতার পাতায় কলমের খোঁচায় হিন্দু আর মুসলিমের সংখ্যার হিসাব আলাদা করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরল। তারা বোঝাতে চাইল যে, তোমরা এক নও, তোমরা সংখ্যার দিক থেকে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত উপায়ে মানুষের অন্তরে 'ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ' আর একে অন্যের প্রতি সন্দেহের বীজ রোপণ করা শুরু হলো। যে পাঠ্যবইয়ে আগে সম্প্রীতির কথা থাকত, সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো উদ্দেশ্যমূলক বিভাজনের গল্প, দেওয়া হলো কৃত্রিম ইতিহাস, যা এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের শত্রু হিসেবে দেখায়। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মঞ্চগুলোতে রাতারাতি এমন কিছু কৃত্রিম 'প্লট' বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হলো, যা প্রমাণ করতে চায়, হিন্দু আর মুসলিমের সংস্কৃতি ও স্বার্থ সম্পূর্ণ আলাদা। এটিই ছিল সেই যুগের সবচেয়ে সফল ও সুপরিকল্পিত কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার।

বছরের পর বছর ধরে চলা মগজ ধোলাইয়ের ফল

বছরের পর বছর ধরে চলা এই মগজ ধোলাই ও প্রচারণার বিষাক্ত ফসল ঘরে তুলতে কুচক্রী মহলের বেশি সময় লাগেনি। এর নির্মম, রক্তাক্ত ও কলঙ্কজনক পরিণতি ছিল ১৯৪০-এর দশকের অবর্ণনীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং (১৬ আগস্ট, ১৯৪৬): তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার কামড়াকামড়ি আর 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'র উসকানিকে কেন্দ্র করে কলকাতার বুকে নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারতম রাত। মাত্র ৭২ থেকে ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে কলকাতার রাস্তাগুলো লাশের স্তূপে পরিণত হয়। হিংস্রতার এমন এক নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, যেখানে শিশু, নারী ও বৃদ্ধ কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি। ইতিহাসের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র কয়েক দিনে কলকাতার বুকে প্রায় ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার নিরীহ মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিল এবং লাখো মানুষ চিরতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। শত বছর ধরে পাশাপাশি আত্মীয়ের মতো বাস করা প্রতিবেশী, কিংবা একসঙ্গে ব্যবসা করা, একসঙ্গে বসে চা খাওয়া মানুষগুলো রাতারাতি একে অন্যের খুনি হয়ে উঠেছিল কেবল ওপর মহলের ছড়ানো গুজবের ওপর ভিত্তি করে।