নাম মো. অপু। বয়স ৩৩ বছর। পেশায় গাড়িচালক। তিনি পুলিশের কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে নিজেকে ‘মেজর জেনারেল’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। কখনো মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে বলতেন, কখনো আসামিদের রিমান্ডে নিতে তাগাদা দিতেন, আবার কখনো আসামিরা জামিন চাইলে তাঁকে জানাতে এবং মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বলতেন। পুলিশ বলেছে, ভুয়া পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতেন অপু।
গ্রেপ্তার ও রিমান্ড
অপু ধরা পড়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিন দিনের রিমান্ড শেষে ১৪ মে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শেষে আদালতে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় নিজের দায়ের করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে তিনি সেনা কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে থানা–পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশনেও ফোন দিতেন।
আদালতে সন্দেহ
মামলার বাদী অপুর কথা ও আচরণে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ৫–এর বিচারকের সন্দেহ হয়। ১১ মে আদালত তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং মুঠোফোন তল্লাশির মৌখিক নির্দেশ দেন। তল্লাশির সময় অপুর মুঠোফোনে ‘মেজর জেনারেল মোহা. মোরশেদ’ নামে একটি সক্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ আইডি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় ভুয়া এই পরিচয় ব্যবহার করতেন তিনি।
আটক ও মামলা
তাৎক্ষণিকভাবে অপুকে আটক করা হয়। পরে তাঁর নামে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয় রাজধানীর কোতোয়ালি থানায়। মামলার বাদী যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অপু তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে ওই ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি চালাচ্ছিলেন।
তদন্তের অগ্রগতি
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক ইমরান হোসেন জানান, আসামি অপুকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভুয়া পরিচয় দিয়ে তদবিরের পেছনে কোনো চক্র জড়িত কিনা, সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অপুর পরিচয়
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অপুর গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মেদী আশুলাইয়ে। বর্তমানে তিনি ঢাকার ভাষানটেক থানাধীন মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকার সাগরিকা খানবাড়িতে থাকেন।
যাত্রাবাড়ী থানায় ভুয়া মামলা
পারিবারিক বিরোধের জেরে অপু তাঁর প্রথম স্ত্রী জেরিন আক্তারের নামে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় জেরিন গ্রেপ্তার হন। পরে জামিন পান। এরপর অপু এ বছরের এপ্রিলে জেরিন আক্তার ও তাঁর শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন স্বজনসহ সাতজনের নামে যাত্রাবাড়ী থানায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন। পুলিশ শুরুতে মামলাটি নিতে চায়নি। ওই সময় যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফোন দেন অপু।
মামলা নিতে চাপ
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল করিম বলেন, মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাটি সত্য নয়। পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে চায়নি। পরে ‘মেজর জেনারেল’ পরিচয়ে বারবার ফোন পেয়ে মামলা নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অপু কয়েকজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। বিদেশে পাঠাতে না পারায় সেই টাকা ফেরতও দিচ্ছিলেন না। টাকা উদ্ধারের জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি পাওনাদারেরা অপুকে আটকে রাখেন।
ডিএমপি প্রসিকিউশনে ফোন
এ ঘটনায় অপু ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এডিসি নাসির আহম্মেদকেও ফোন দিয়েছিলেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করা হয়েছিল। সেখানে একজন মেজর জেনারেলের নাম–ছবি ছিল। ওই পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছিল, মামলার আসামিরা জামিন আবেদন করলে তাঁকে যেন জানানো হয়। নাসির আহম্মেদ আরও বলেন, ‘আমাকে দুদিন ফোন দিয়েছিল। একদিন মেজর জেনারেলের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফোন দেওয়া হয়। আরেক দিন ওই সেনা কর্মকর্তার গাড়িচালক পরিচয়ে ভিন্ন একটি নম্বর থেকে ফোন আসে।’
অবশেষে ধরা পড়া
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ৫-এর বিচারকের আদালতে ১১ মে যাত্রাবাড়ী থানায় অপুর প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে করা মামলার জামিন শুনানি ছিল। আদালতে অপুও ছিলেন। তাঁর কথাবার্তা ও আচরণে বিচারকের সন্দেহ হলে তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও মুঠোফোন তল্লাশির মৌখিক নির্দেশ দেন। এরপর অপুর মুঠোফোনে থাকা ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের বিষয়টি সামনে আসে। গ্রেপ্তার ও রিমান্ড পেরিয়ে অপুর এখন ঠাঁই হয়েছে কারাগারে।
প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটির বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এমন প্রতারকদের যথোপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



