ইরান যুদ্ধে আটকে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ২১ দিনের আতঙ্ক ও ফেরার গল্প
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় তেহরানে আটকে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাকিল হোসেনের ২১ দিনের আতঙ্কময় অভিজ্ঞতা। বিশেষ বিমানে দেশে ফিরে পরিবারের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পেলেও এখনো তাড়া করে যুদ্ধের স্মৃতি।
যেভাবে শুরু হলো বিভীষিকা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের তেহরানের খাজা নাসিরউদ্দিন তুসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে বসে ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। মনে হলো বড় ধরনের ভূমিকম্প। কিন্তু পরমুহূর্তেই জানা গেল, তেহরানের তিনটি স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আকাশ প্রকম্পিত হচ্ছিল মিসাইল আর বিস্ফোরণের শব্দে। মানুষ হন্যে হয়ে ছুটছিল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
শাকিল হোসেন বলেন, "এটা ছিল রুদ্ধশ্বাস লড়াই। টানা ২১ দিনের উৎকণ্ঠা, ইন্টারনেটহীন বিচ্ছিন্ন পৃথিবী আর কনকনে শীতের মধ্যে আস্তারা সীমান্তে কাটানো নির্ঘুম রাতগুলো—যা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে পড়ার মুহূর্ত
শাকিল হোসেন তেহরানের খাজা নাসির তুসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পুরকৌশল বিভাগের একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতেন, হল ছেড়ে যাওয়ার মতো জায়গা ছিল না। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও হলগুলো খোলা রাখা হয়। রেজিস্ট্রার অফিস থেকে জানানো হয়, আতঙ্কিত না হয়ে হলে অবস্থান করতে।
তিনি বলেন, "চারদিকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ। নিজ চোখে দেখেছি মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল উড়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় কল দেওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না।"
দূতাবাসের সহায়তা ও ফেরার পথ
শাকিল ও তার বন্ধু আলী আমিন তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিরাপদ আশ্রয় বা দেশে ফেরত পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা জানান। পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে দূতাবাস তেহরান থেকে সাভেহ শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১ মার্চ দিবাগত রাতে শাকিল ও অন্যান্য বাংলাদেশিরা সেখানে গিয়ে হোটেলে অস্থায়ী কার্যক্রম শুরু করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় ১৯ মার্চের মধ্যে ১৮৬ জনের ট্রাভেল পাস হাতে আসে। ৯টি বাসে করে আস্তারা সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়। সীমান্তে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, কর্মকর্তারা আতঙ্কে পালিয়ে গেছেন। ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কনকনে শীতের মধ্যে রাত কাটাতে হয়।
আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরা
সকাল ৮টায় কর্মকর্তারা ফিরে এলে কাজ শুরু হয়। শাকিলের আজারি ভাষা জানা থাকায় যোগাযোগ সহজ হয়। ভোরে আজারবাইজানে প্রবেশের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেখা মেলে। বাকু বিমানবন্দর হয়ে বিশেষ ফ্লাইটে ২১ মার্চ রাতে ঢাকায় পৌঁছান তারা।
শাকিল বলেন, "বিমানবন্দর থেকে নেমে ঢাকার চাচার বাড়িতে উঠি। পরদিন ফরিদপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা বুকে টেনে নেন। মনে হলো, যুদ্ধের ময়দান থেকে নিরাপদে ফিরেছি।"
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চিন্তা
বর্তমানে ফরিদপুরের বোয়ালমারীর ভিমপুর গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকলেও যুদ্ধের স্মৃতি তাকে তাড়া করে। বিশ্ববিদ্যালয় দুই মাসের ছুটি দিয়েছে, তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। শাকিল বলেন, "সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক মাস পর স্নাতক শেষ হতো। এখন কী হবে, দুই মাস পর ফিরতে পারব কিনা জানি না।"
তার চাচা নজরুল ইসলাম বলেন, "যুদ্ধের সময় আমরা আহার ছেড়ে দিয়েছিলাম। সরকার বিশেষ ফ্লাইটে শাকিলসহ ১৮৬ জনকে ফিরিয়ে আনায় কৃতজ্ঞ।" বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রকিবুল হাসান বলেন, "প্রয়োজনে দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলে তার ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ব্যবস্থা নেব।"
এই গল্প শুধু শাকিল হোসেনের নয়, ইরানে আটকে পড়া অসংখ্য বাংলাদেশির সংগ্রাম ও ফেরার প্রতিচ্ছবি।



