দক্ষিণ আফ্রিকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহানের মৃত্যু, শোকে মায়ের আহাজারি
দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত সোহান হোসেনের মৃত্যুসংবাদে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা শাহিনুর আকতার। সতেরো কি আঠারো বছর বয়সী এই তরুণ পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণ হারান তিনি।
মায়ের আকুতি: শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চাই
ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের চিকনমাটি গ্রামের বাসিন্দা দুলাল হোসেনের ছেলে সোহান হোসেনের মৃত্যুর খবর শুনে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছেন, ‘শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখত চাই।’ চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি মা–বাবা, ভাই-বোনকে রেখে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন সোহান। সেখানে জোহানেসবার্গের কেতলেহংয়ে তিনি তাঁর এক চাচা সিরাজুল ইসলামের মুদিদোকানে কাজ করতেন।
ঘটনার বিবরণ: দোকান বন্ধের সময় এলোপাতাড়ি গুলি
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে দোকান বন্ধ করার ঠিক আগে দুর্বৃত্তরা এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলেই মারা যান সোহান। বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রাশেদ নামে সিরাজুলের এক আত্মীয় সোহানের বাড়িতে ফোন করে প্রথমে জানান, সোহান হাসপাতালে আছেন। পরে কুমিল্লার এক যুবকের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, সোহান আর বেঁচে নেই।
মায়ের বিলাপ ও স্বপ্নভঙ্গ
শুক্রবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে সোহানের স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। তখন বিলাপ করে কাঁদছিলেন মা শাহিনুর আকতার। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছিলেন না। আক্ষেপ করে শাহিনুর আকতার বলছিলেন, ‘বিদেশ যাবার সময় সোহান কহে গেইছে, “মা তোর কোনো কিছুর কষ্ট হবে না।” আমার অ্যাজমার অসুখ, ভালো হয় না। সোহান কহছে ,“মা তুই চিন্তা করিস না। মুই তোর চিকিৎসা করামো।”’ কথাগুলো বলতে বলতে মূর্ছা যান সোহানের মা।
লাশ দেশে আনার আকুতি ও পরিবারের পরিকল্পনা
ছেলের লাশ দেশে আনার আকুতি জানিয়ে শাহিনুর বলেন, ‘ছুয়াটাক আর দেখতে পাব না। শেষবারের মতো সোহানের মুখটা দেখিবা চাও। ওক নিজ হাতে শেষ গোসল করাবা চাও। সরকারের কাছে আবেদন করি ছেলেকে যেন আনে দেয়।’ সোহানের চাচা মো. মানিক বলেন, ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করে সোহান। আমাদের এক চাচাতো ভাই দক্ষিণ আফ্রিকা থাকে। সে সম্প্রতি বাড়ি এসেছিল। তার সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে সোহানেরও ইচ্ছা জাগে আফ্রিকা যাওয়ার। আমরা তাকে অনেক করে বললাম এইচএসসি পরীক্ষাটা দাও। এটা শোনে সোহান বলে, “চার বছর পরে যাওয়ার চেয়ে, না হয় চার বছর আগেই গেলাম।”
আর্থিক ত্যাগ ও স্বপ্নের অবসান
সোহানের বাবা দুলাল হোসেন জানান, জমি বন্ধক আর গরু বিক্রি করে সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করে সোহানকে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠিয়েছিলেন। বাড়ি এসে অনেক কিছু করার পরিকল্পনা তাঁর। বৃহস্পতিবারই বাড়িতে টাকা পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। সোহানের লাশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কথা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হকের সঙ্গে। তিনি আশ্বাস দেন, পরিবারটি আবেদন করলে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



