জীবনের পড়ন্ত বেলায় শৈশব-কৈশোরের ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন
কবীর সুমনের কবিতার মতোই, জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে মনে হয় জীবনের চৌদ্দ আনাই পাওয়া হয়ে গেছে। শিক্ষা, চাকরি, সচ্ছলতা, বাড়ি, গাড়ি—সব বস্তুগত অর্জন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের পরও মানুষ থেমে থাকে না। তাদের চাহিদা আরও বেড়ে যায়: আরও বেশি শিক্ষার ডিগ্রি, আরও ভালো বেতনের চাকরি, আরও বড় বাড়ি, আরও সুন্দর মডেলের গাড়ি। এভাবেই চলতে থাকে, চলতে চলতেই একসময় সময় ফুরিয়ে আসে। মানুষ তবু আক্ষেপ নিয়েই জীবনের অপর পারে পাড়ি জমায়। আসলে জীবনে তো চাওয়া–পাওয়ার শেষ নেই।
সুখের চেয়ে শান্তির খোঁজ
আমি যেহেতু ভাববাদী মানুষ, তাই আর দৌড়াতে ইচ্ছে করে না। এখন সুখের চেয়ে শান্তির খোঁজ বেশি করি। প্রয়োজনটুকু যেহেতু মিটে গেছে, তাই জীবনের কাছে আর কোনো চাওয়া নেই। এখন শুধুই ফিরে পেতে ইচ্ছে করে নিজের শৈশব আর কৈশোরের অকৃত্রিম দিনগুলো। ফিরে পাওয়া অসম্ভব জেনেও ফিরে পাওয়ার এক অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিন কাটাই। এখন খুব ইচ্ছে করে ছোটবেলাকার সেই মাটির ঘরের মেঝেতে খালি গায়ে শুয়ে প্রাণ জুড়াতে। সেই ঘরের বেড়া ও চাল ছিল শণের, এর ফাঁকে বাতাস আটকে থাকত বলে গরম ও শীতের প্রকোপ ততটা টের পাওয়া যেত না। মনে হতো যেন ঘরটা প্রাকৃতিকভাবেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
গ্রামীণ জীবনের সরলতা
দুরন্ত সকাল পেরিয়ে, উদাস দুপুর কখন চলে আসত আমরা টেরই পেতাম না। দুপুরে বাড়ি ফিরে পেটে দুটো দিয়েই আবার বেরিয়ে পড়া। খেলাধুলায় কেটে যেত পুরো বিকেলবেলা। এরপর বাড়ি ফিরে শরীরে আর জেগে থাকার শক্তি থাকত না। তবু জেগে থাকতাম রেডিও শোনার জন্য। তিন ব্যাটারির রেডিওতে দিন–দুনিয়ার সব খবরের পাশাপাশি গান নাটক শোনা যেত। তখনো আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ তার কালো থাবা বসায়নি, তাই আমরা যা দেখতাম, যা শুনতাম তারই প্রায় সবই বিশ্বাস করতাম। আর গ্রামের রাস্তাঘাটও তখনো পাকা হয়নি, আমাদের তাই জুতো স্যান্ডেল পরার বিলাসিতা ছিল না। সারা দিন বালির মধ্যে খেলে চাপ কলের পানির নিচে মাথা দিলেই হয়ে যেত গোসল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক পা অপর পায়ের সঙ্গে বাড়ি দিয়ে ঝাঁকিয়ে নিয়েই বিছানায় চলে যাওয়া যেত।
দাদির কেচ্ছা ও স্বপ্নের জগৎ
বিছানায় যেয়ে শুরু হতো আরেক খেলা। জোর করে নিজেকে জাগিয়ে রাখা; কারণ, দাদির কাছ থেকে কেচ্ছা শুনতে হবে। কুপি বাতি নিভিয়ে দিয়ে দাদি শুরু করতেন তাঁর কেচ্ছা। সেই কেচ্ছা আমাদের কল্পনায় হাজির করত কত–না চরিত্র। চাঁদের বুড়ির চরকা কাটার শেষ নেই। পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে ডালিমকুমার যাচ্ছে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে সেই কোন দূরের দেশে। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, পথ আর ফুরোয় না। রাজকুমারী কাজলরেখার দুঃখের আর শেষ হয় না। এগুলো শুনতে শুনতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম। আর ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে হয়ে উঠতাম কখনো ডালিমকুমার আবার কখনো চাঁদের বুড়ির নাতি ছেলে।
কৈশোরের রঙিন কল্পনা
কৈশোরের সময়টা যেন আরও দুরন্ত। মনে একটু একটু করে রং লাগতে শুরু করেছে। তৈরি হয়েছে বিপরীত লিঙ্গের মানবীর প্রতি ভালোলাগা। সারা দিনমান কেটে যেত তাকেই কল্পনা করে। কীভাবে সাহস করে তার সামনে হাজির হব, তার সঙ্গে কী কী কথা বলব, কীভাবে কথা বলব—এসবের কল্পনা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়তাম। তারপর তার সঙ্গে কল্পনার কথাগুলো হতো স্বপ্নে। বাস্তবে তার ধারেকাছেও যাওয়া হতো না। এরপর মুখোমুখি হতে হলো জীবনের বাস্তবতার। তখন আবার শৈশব–কৈশোর ভুলে জীবনের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া। এরপর এখন যখন পেছন ফিরে দেখি, শুধুই শৈশব–কৈশোরের সেই অকৃত্রিম দিনগুলোর কথা বারবার মনে পড়ে। আর আমি আবারও স্বপ্নে বারবার ফিরে যায় সেই দিনগুলোতে।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও বাস্তবতা
সেদিন কথা প্রসঙ্গে এক বন্ধুকে বলছিলাম এসব কথা। দেশে ফিরে যাব বাচ্চা দুটার বয়স আঠারো পার হওয়ার পর। সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রামের পথের ধার থেকে দাঁতছোলা গাছের কাণ্ড দিয়ে দাঁতন বানিয়ে দাঁত মেজে নেব। পাড়ার মোড়ের চাপকল থেকে কুলি করে বসে যাব পাশের চায়ের দোকানে। গরম গরম চা আর লাঠি বিস্কুট দিয়ে নাশতা সেরে নেব। তারপর গ্রামের চাচাদের সঙ্গে অন্যের খেতে দিনমজুরি খাটব যাতে আরও বেশি নিবিড়ভাবে মাটির কাছে থাকা যায়। দুপুরের জমির আইলে বসে খেয়ে নেব বাড়ি থেকে আনা খাবার। বিকেলে আবার গ্রামের চায়ের দোকানে বসে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করব। অবসরে ছোট বাচ্চাদের পড়াব আর বেতন হিসেবে নেব ওদের খেতের তরতাজা ফলমূল ও শাকসবজি। আহা কী অকৃত্রিম একটা জীবন।
ছোটবেলা থেকেই আমরা একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে বড় হই। এরপর যখন বড় হয়ে যাই তখন বুঝি এটা একটা ফাঁদ। আর ফাঁদ থেকে মুক্তি নেই। খুব কম মানুষই আছে যারা সমাজের প্রচলিত নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে। আমার অত সাহস নেই। আমি ভাবছি সন্তানদের আঠারো হলে দায়িত্ব শেষ হবে, তখন বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাবে তখন আরেক দায়িত্ব এসে জুটেছে। আরেকটা বিষয়—সেটা হচ্ছে আমি যে ততদিন বেঁচে থাকব তার নিশ্চয়তা কোথায়। তাই বাকি জীবনটা স্বপ্ন দেখেই কাটাতে হবে। আমার সেই বন্ধুটাও একই কথা বলল। স্বপ্ন দেখতে থাকো। আমি তখন বললাম আমার গুরু নচিকেতাও একই কথা বলেন—‘যখন সময় থমকে দাঁড়ায়, নিরাশার পাখি দু’হাত বাড়ায়, খুঁজে নিয়ে মন নির্জন কোন, কি আর করে তখন, স্বপ্ন! স্বপ্ন! স্বপ্ন! স্বপ্ন দেখে মন।’



