যুদ্ধের আঘাতে ভেঙে পড়া একটি পরিবারের করুণ ঈদ
ঈদুল ফিতরের উৎসবের জোয়ারে যখন সারা দেশ মেতে উঠেছে, তখন চট্টগ্রাম নগরের একটি বাসায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বাহরাইনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে নিহত প্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের পরিবার এবারের ঈদ কাটাচ্ছে চরম বিষাদের মধ্য দিয়ে।
বাবার ছবি নিয়ে ঈদ কাটাচ্ছে মেয়ে
কলেজপড়ুয়া মেয়ে তাসমিম তামান্নার জন্য এই ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। ২৭ বছর ধরে বাহরাইনে কর্মরত তার বাবা এবার দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। এখন বাবার মরদেহ বাহরাইনের হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে, আর তাসমিম মুঠোফোনে জমা রাখা বাবার ছবি দেখেই সময় কাটাচ্ছে।
চট্টগ্রামের বউবাজার কেতুরা মসজিদ গলি এলাকায় অবস্থিত তাদের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ঈদের আনন্দ থাকলেও এই পরিবারের ঘরে নেমে এসেছে নিঃশব্দ কান্না আর গভীর শোকের আবহ। নতুন জামা থাকলেও পরার কোনো ইচ্ছা নেই তাসমিমের।
২৭ বছর প্রবাসে, ১৫ বছর ঈদ করেননি দেশে
আবুল মহসিন তারেক বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। গত ১৫ বছরে তিনি একবারও দেশে এসে ঈদ পালন করতে পারেননি। এবার রোজার মধ্যেই দেশে আসার এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর দৃঢ় পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
"বাবা সব সময় আমাকে বলতেন, এবার নিশ্চয়ই দেশে আসব। আমাদের সঙ্গে ঈদ করব। কিন্তু যুদ্ধ সবকিছু নষ্ট করে দিল," বলে কান্না ভেঙে পড়ে তাসমিম তামান্নার।
ভিডিও কল আর সালামির স্মৃতি
প্রতিবছর ঈদের সময় বাবার অনুপস্থিতির কষ্ট লাঘব করতে বিশেষ ব্যবস্থা করতেন আবুল মহসিন তারেক। চাঁদরাত থেকে শুরু করে ঈদের দিন পর্যন্ত মেয়ের সঙ্গে দফায় দফায় ভিডিও কলে কথা বলতেন। আগেই স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতেন মেয়ের নতুন জামা-জুতা কেনার জন্য। ঈদের সালামিও দিতে ভুলতেন না।
তাসমিম স্মৃতিচারণ করে বলেন, "ভিডিও কলে বাবাকে সালাম করতাম। এরপর মা বাবার পাঠানো টাকা আমাকে সালামি হিসেবে দিতেন। বাবা চাইতেন না আমার কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ থাকে।"
বাবার জন্য পাঞ্জাবি কিনতেন মেয়ে
বাবার দেওয়া হাতখরচের টাকা থেকে কিছু অংশ জমিয়ে রাখতেন তাসমিম। সেই জমানো টাকা দিয়ে প্রতিবছর বাবার জন্য ঈদের পাঞ্জাবি কিনে পাঠাতেন বাহরাইনে। গত বছরও তিনি বাবার জন্য পাঞ্জাবি কিনে পাঠিয়েছিলেন, যা পরে আবুল মহসিন তারেক ঈদের নামাজ পড়েছিলেন।
"এবার তো আরও বড় স্বপ্ন ছিল," বলে কাঁদতে কাঁদতে যোগ করেন তাসমিম, "বাবা দেশে আসবেন। একসঙ্গে মার্কেটে গিয়ে বাবাকে পছন্দের পাঞ্জাবি কিনে দেব। কিন্তু যুদ্ধ আমার বাবাকে কেড়ে নিল, আমার ঈদের আনন্দও কেড়ে নিল।"
আত্মীয়দের সান্ত্বনা, কিন্তু শূন্যতা কাটছে না
ঈদের আগের রাত থেকে তাসমিম ও তার মা রোকেয়া বেগমকে সান্ত্বনা দিতে বাসায় অবস্থান করছেন তারেকের শ্যালক রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব। তিনি বলেন, "আগে কত আনন্দ হতো। দুলাভাই ভিডিও কলে আমাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। এবার আমরা এসেছি, কিন্তু তিনি নেই। এমন হতাশার ঈদ কখনো আসেনি।"
স্ত্রী রোকেয়া বেগম স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে প্রায় নীরব হয়ে গেছেন। নিজের কক্ষে চুপচাপ সময় কাটান তিনি। চারপাশে আত্মীয়স্বজন থাকলেও চাপা কান্নাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
বাবার মরদেহ ফেরত চায় মেয়ে
জীবিত বাবাকে আর ফিরে পাবে না জেনেও তাসমিম তামান্না সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন তার বাবার মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরত আনা হয়। অন্তত বাবার শেষ স্পর্শটুকু নেওয়ার সুযোগ যেন তিনি পায়।
তামান্নার আকুতি, "আমার বাবাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু যেন আর কোনো মেয়েকে এভাবে বাবাকে হারাতে না হয়।"
একটি পরিবারের ঈদ আজ থমকে গেছে যুদ্ধের নির্মমতায়। যে ঈদ হওয়ার কথা ছিল পুনর্মিলনের, দীর্ঘদিন পর বাবার কোলে মেয়ের মুখ দেখার, তা হয়ে উঠেছে চিরবিদায়ের স্মৃতি। ঈদের আনন্দের মধ্যেও এই ঘরের নীরবতা সকলকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—যুদ্ধ কি কখনো কোনো পরিবারের সুখ বয়ে আনে?



