মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বিপাকে বিদেশে কর্মসংস্থান, ছাড়পত্র কমেছে ৫০ শতাংশ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বিপাকে বিদেশে কর্মসংস্থান, ছাড়পত্র কমেছে ৫০%

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বিপাকে বিদেশে কর্মসংস্থান, ছাড়পত্র কমেছে ৫০ শতাংশ

বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যবস্থা এখন মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এই খাতটি গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে বিদেশে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নেওয়ার হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এই হ্রাস সরাসরি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আকাশসীমা বন্ধ ও ফ্লাইট অনিয়মিত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রবাসীদের অনিশ্চয়তা ও আটকে পড়ার ঘটনা

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি এখন বিপদে আছেন। ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে কেউ কেউ আটকাও পড়েছেন, যাদের ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লার ফরহাদ হোসাইন ওমানে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট কাজ করেন এবং ১৫ দিনের ছুটিতে এসে আটকা পড়েছেন। তাঁর মতো অনেকেই কোম্পানির চাপ সত্ত্বেও ফ্লাইট না থাকায় যেতে পারছেন না।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে, যা প্রবাসীদের চলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কর্মী পাঠানোর হ্রাস ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বিএমইটির তথ্য বলছে, ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২১ হাজার ১২২ জন, যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৭৪৪ জন। এই অর্ধেকের বেশি হ্রাস যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব নির্দেশ করে। যদিও সৌদি আরবে কিছু ফ্লাইট চালু থাকায় সীমিত সংখ্যক কর্মী যেতে পারছেন, কিন্তু অনেকে ভয়ে এখন যেতে চাইছেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন, এবং এখন যেতে না পারায় ঋণ শোধ করতে না পারায় পরিবারগুলো চাপে পড়ছে। তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলামের মতে, ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে আছেন, এবং যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের দুর্যোগ নেমে আসতে পারে।

সরকারের পদক্ষেপ ও নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই সংকট মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধকবলিত প্রবাসীদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক হটলাইন ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে ৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকার নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে জোর দিচ্ছে। দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার মাধ্যমে জাপান ও ইউরোপের মতো সম্ভাবনাময় বাজারগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা চলছে। এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও আলোচনা প্রক্রিয়া চলমান।

বিকল্প বাজারের অভাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

বিদেশে কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন, যার মধ্যে ৯০ ভাগ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। এই কেন্দ্রীকরণই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, অবৈধ পথে অনিয়মিত অভিবাসনে ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতালি যেতে লিবিয়া বা রাশিয়া চক্রের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোর বাংলাদেশ দূতাবাসকে সক্রিয় হতে এবং প্রতিদিন দেশে তথ্য পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দুজন, বাহরাইনে ও আরব আমিরাতে একজন করে প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেছেন, যা এই সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সময় ও সম্পদ প্রয়োজন হবে।