শনির বলয় রহস্য: রাখাল চাঁদের তরঙ্গ ও অনুরণনে বলয়ের গঠন বজায়
শনির বলয় রহস্য: রাখাল চাঁদের তরঙ্গে বলয়ের গঠন

শনির বলয় রহস্য: রাখাল চাঁদের তরঙ্গ ও অনুরণনে বলয়ের গঠন বজায়

শনি গ্রহের বলয় ব্যবস্থা বহু দশক ধরেই গ্রহবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে। এই বলয়গুলো অসংখ্য ক্ষুদ্র বরফ ও ধূলিকণার সমষ্টি, যেগুলো এক সূক্ষ্ম মহাকর্ষীয় ভারসাম্যের মাধ্যমে স্থিতিশীল থাকে। বলয়ের ভেতরে ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থানকারী কিছু ক্ষুদ্র উপগ্রহ এই ভারসাম্য রক্ষা করে, যাদের বলা হয় রাখাল চাঁদ বা শেফার্ড মুন।

রাখাল চাঁদের সৃষ্টি ও অ্যাক্রিশন হাইপোথিসিস

এই রাখাল চাঁদের সৃষ্টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের নানা তত্ত্ব ও ধারণা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অ্যাক্রিশন হাইপোথিসিস। এই মতবাদ অনুযায়ী, গ্রহ জন্মের প্রাক্কালে গ্যাসীয় বলয়ে থাকা ধূলিকণা, বরফকণা ও ছোট বস্তুগুলো মহাকর্ষ বল ও পারস্পরিক সংঘর্ষের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একত্রিত হয়। এরপর এগুলো একটি বড় গোলাকার বস্তুতে পরিণত হয়ে রাখাল চাঁদের সৃষ্টি করে।

আধুনিক গ্রহবিজ্ঞানে রাখাল চাঁদগুলোকে কেবল গ্রহ গঠনের প্রাথমিক নীহারিকা পর্যায়ের অবশিষ্টাংশ হিসেবে দেখা হয় না; বরং বলয় ও উপগ্রহের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৯ সালে পিটার গোল্ডরিচ ও স্কট ট্রিমেইন তাত্ত্বিকভাবে এই চাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। পরে নাসার বিজ্ঞানী জেফ্রি কুজি ও তাঁর সহকর্মীরা শেফার্ড মুনের ধারণাটি বিশদভাবে প্রস্তাব করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভয়েজার-১ ও ক্যাসিনি মিশনের পর্যবেক্ষণ

পরের বছর ভয়েজার-১ মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণ এই ধারণাকে বাস্তবে প্রমাণ করে। বিজ্ঞানীরা তখন বলেছিলেন, ‘এই ছোট চাঁদগুলোই বলয়কে পরিষ্কার করছে এবং কণাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখছে, ঠিক একজন রাখালের মতো।’ এই চাঁদগুলোর মহাকর্ষ বল কীভাবে বলয়ের কাঠামোকে প্রভাবিত করে, তা-ও তাঁরা বিশ্লেষণ করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরে ক্যাসিনি মিশনের প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, শনির বলয় ব্যবস্থা একটি গতিশীল ও বিবর্তনশীল কাঠামো। শনি গ্রহের চারপাশের বলয়গুলো আসলে বরফ ও ধূলিকণায় ভরা থাকে। এই বলয়গুলোর ভেতরে ও আশপাশে অনেক ছোট উপগ্রহ বা চাঁদ ঘোরে। এদের কাজ অনেকটা পশুপালকের মতো। একজন রাখাল যেভাবে ভেড়ার পালকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখেন, ঠিক তেমনি এই উপগ্রহগুলো বলয়ের কণাগুলোকে একটি সীমার মাঝে আটকে রাখে, যেন কণাগুলো ছড়িয়ে না পড়ে।

তরঙ্গ ও অনুরণনের ভূমিকা

নিজেদের মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে এরা বলয়ের গঠন ও সীমা বজায় রাখে। ফলে অনেক সময় বলয়ের মাঝে ফাঁকা জায়গা বা গ্যাপ তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, শনির এফ (F) রিংয়ের দুই পাশে থাকা প্যান্ডোরা ও প্রমিথিউস দুটি বিখ্যাত শেফার্ড মুন। অনেক গবেষক মনে করেন, এখানে শুধু সরাসরি মহাকর্ষ বল নয়, বরং তরঙ্গ ও অনুরণন প্রক্রিয়াই বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

শেফার্ড মুনগুলো সরাসরি মহাকর্ষ প্রয়োগ করার চেয়ে তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ, সরাসরি মহাকর্ষীয় টান প্রয়োগ করলে বলয়ের বস্তুগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হতো। ফলে এদের আয়তন বেড়ে যেত কিংবা চাঁদগুলো ক্ষয়ে যেত। কিন্তু তরঙ্গায়িত করলে বলয়ের বস্তুগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ না ঘটে তারা দূরে সরে যায়। অবশ্য মহাকর্ষীয় টানের ফলেই বলয়ের মধ্যে তরঙ্গ তৈরি হয়, এবং সেই তরঙ্গ কণাগুলোর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে।

উদাহরণ ও ব্যাখ্যা

উদাহরণ হিসেবে পুকুরে ঢিল ছোড়ার কথা ভাবা যেতে পারে। পানিতে ঢিল ছুড়লে যেমন ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় এবং ভাসমান ময়লা দূরে সরে যায়, ঠিক তেমনি বলয়ের মধ্যে থাকা চাঁদগুলো সর্পিল ঘনত্বের তরঙ্গ সৃষ্টি করে। ফলে বলয়ের কণাগুলো দূরে সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি করে। শনি গ্রহের সব চাঁদ এর নিরক্ষীয় সমতলে পুরোপুরি একই রেখায় থাকে না। অনেক চাঁদের কক্ষপথ সামান্য ঢালু থাকে।

ফলে চাঁদের মহাকর্ষ বল বলয়ের কণাগুলোকে শুধু পাশ থেকে নয়, বরং ওপর-নিচে দোলাতে থাকে। এই দোলন যখন অনুরণনের মাধ্যমে বাড়তে থাকে, তখন বলয় আর সমতল থাকে না। বলয়ে ঢেউখেলানো ভাঁজ তৈরি হয়। ধরুন, আপনি দড়িতে একটি বল বেঁধে তা হাতে ধরে আছেন। দড়িটিকে এলোমেলোভাবে ওপর-নিচ নাড়ালে বলটি সামান্য নড়বে। কিন্তু আপনি যদি একই ছন্দে বারবার নাড়াতে থাকেন এবং সেই ছন্দটি যদি বলের নিজস্ব দোলনের ছন্দের সঙ্গে মিলে যায়, তবে বলটি আরও জোরে দুলতে শুরু করবে।

মিমাস ও ক্যাসিনি ডিভিশনের ভূমিকা

ঠিক একইভাবে, শনির কোনো চাঁদ নির্দিষ্ট ছন্দে বলয়ের কণাগুলোকে টানলে অনুরণন তৈরি হয় এবং ঢেউ বা তরঙ্গের মাত্রা বেড়ে যায়। মিমাসের মতো শনির কিছু বড় উপগ্রহও বলয়ের কণাগুলোর ওপর নিয়মিত মহাকর্ষীয় টান প্রয়োগ করে। বলয়ের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে থাকা কণাগুলোর কক্ষপথ যদি এমন হয় যে তারা নির্দিষ্ট সময়ে উপগ্রহটির সঙ্গে একটি অনুরণনে পড়ে, তবে ওই স্থানের কণাগুলো ধীরে ধীরে স্থানচ্যুত হয়ে যায়।

ফলে ওই জায়গাটি ফাঁকা হয়ে একটি গ্যাপ তৈরি করে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ক্যাসিনি ডিভিশন। শনির সবচেয়ে বড় ও স্পষ্ট এই গ্যাপটি মূলত মিমাস উপগ্রহের সঙ্গে ২:১ রেজোন্যান্সের কারণেই তৈরি হয়েছে। এই রেজোন্যান্সের ফলে বলয়ের ওই অংশ থেকে কণাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, কোনো চাঁদ গ্রহের মহাকর্ষের কারণে যখন এমনভাবে ঘোরে যে তার একটি দিক সব সময় গ্রহের দিকে মুখ করা থাকে এবং কক্ষপথে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে অন্য চাঁদ বা কণার সঙ্গে গাণিতিক ছন্দে থাকে, তখন বলয়ের কাঠামো ও গতিশীলতা চমৎকারভাবে বজায় থাকে।

সরলীকৃত তুলনা

বিষয়টি সহজে বুঝতে বলয়টিকে একটি সরু রাস্তা এবং প্রমিথিউস ও প্যান্ডোরাকে সেই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার পুলিশের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তারা এমনভাবে গ্রহের দিকে তাকিয়ে ঘোরে এবং ঠিক নির্দিষ্ট ছন্দে টহল দেয়, যাতে রাস্তার (বলয়ের) কোনো কণা বাইরে বের হতে না পারে! এভাবেই রাখাল চাঁদগুলো তাদের জোয়ার-ভাটা বন্ধন এবং উল্লম্ব অনুরণন ব্যবহার করে শনির বলয়গুলোকে এতটা সুন্দরভাবে ধরে রেখেছে।