চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরলেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী
চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণের ঐতিহাসিক অভিযান সম্পন্ন করে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। শনিবার (১১ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে তাদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশ ডাউন করে অবতরণ করে। এই মিশনের মাধ্যমে ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবার মানুষের চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে, যা মহাকাশ গবেষণায় একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
নভোচারীদের সুস্থতা নিশ্চিত
সমুদ্রে অবতরণের পর আর্টেমিস-২ মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা নভোচারীদের অবস্থা সম্পর্কে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কী অসাধারণ এক যাত্রা ছিল। আমরা স্থিতিশীল আছি। চার নভোচারীই সম্পূর্ণ সুস্থ (গ্রিন) আছেন।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, চারজন নভোচারীই শারীরিকভাবে ভালো আছেন এবং তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই।
উদ্ধার প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আর্টেমিস-২ ল্যান্ডিং অ্যান্ড রিকভারি ডিরেক্টর লিলিয়ানা ভিয়ারিয়াল জানিয়েছেন, সমুদ্রে অবতরণের দুই ঘণ্টার মধ্যে নভোচারীদের ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে উদ্ধার করা হবে। এরপর তাদের মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ইউএসএস জন পি মুরথা’র মেডিকেল বে-তে পৌঁছে দেওয়া হবে। উদ্ধার প্রক্রিয়ার কিছু ধাপ নিম্নরূপ:
- প্রথমে নভোচারীদের ওরিয়ন ক্যাপসুলের সঙ্গে যুক্ত একটি ভেলায় (রাফট) আনা হবে, যাকে ‘ফ্রন্ট পোর্চ’ বলা হয়।
- এরপর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজে নেওয়া হবে।
- নাসার ফ্লাইট কন্ট্রোলার জেফ রাডিগানের মতে, সমুদ্র শান্ত থাকলে ক্যাপসুল থেকে এই উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগতে পারে।
জাহাজে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বিমানে করে নভোচারীদের হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ১০ দিনের রোমাঞ্চকর চন্দ্রাভিযান সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে।
মিশনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও রেকর্ড
১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে শুরু হওয়া এই মহাকাশযাত্রা একাধিক নতুন ইতিহাস গড়েছে। মিশনটির উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
- চাঁদের দূরবর্তী অংশে অবস্থানের সময় পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ড (২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল) ভেঙে দিয়েছে।
- ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণের অনন্য ইতিহাস গড়েছেন।
- ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
- জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক হিসেবে চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণ করেছেন।
নভোচারীরা এই চন্দ্রাভিযানে বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন, যার মধ্যে চন্দ্রপৃষ্ঠে অন্তত ছয়টি উজ্জ্বল উল্কাপাতের ঝলক সরাসরি দেখা অন্যতম। আর্টেমিস-২ অভিযানটি ছিল ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের পদচিহ্ন ফেলার নাসা-পরিকল্পনার একটি পরীক্ষামূলক ধাপ, যা ভবিষ্যত মহাকাশ অভিযানের পথ প্রশস্ত করছে।
সরাসরি সম্প্রচার ও প্রতিক্রিয়া
নাসা প্লাস, অ্যামাজন প্রাইম, নেটফ্লিক্স ও অ্যাপল টিভিতে ঐতিহাসিক এই প্রত্যাবর্তন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এই সফল মিশন মহাকাশ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে এবং মানবজাতির জন্য চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতির স্বপ্নকে আরও বাস্তবায়নের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।



