মহাকাশে মানব প্রংশবৃদ্ধি: স্বপ্নের পথে বিজ্ঞানের বাধা
ইলন মাস্কের মতো স্বপ্নদ্রষ্টারা আমাদের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যতের কল্পনা করে চলেছেন, যেখানে মানুষ পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশের অন্য গ্রহে স্থায়ী বসতি স্থাপন করবে। লাখ লাখ বছর আগে আমাদের আদিপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক তেমনই একদিন আমরা সৌরজগতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ব বলে আশা করা হচ্ছে।
এই কল্পনা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর মনে হলেও, মহাকাশে রকেট পাঠানো এবং সেখানে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি করা কি একই রকম সহজ? সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রগুলোতে আমরা প্রায়শই মহাকাশযানের ভেতরে মানুষের জন্ম নেওয়ার দৃশ্য দেখি, কিন্তু বাস্তব বিজ্ঞান এখানে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখেছে।
গবেষণার চাঞ্চল্যকর ফলাফল
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটির মধ্যে মানুষের শুক্রাণু ডিম্বাণুর দিকে সঠিকভাবে সাঁতার কাটতে পারে না। এমনকি যদি তারা কষ্ট করে মিলিত হয়ে ভ্রূণ তৈরি করে, তবুও পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের তুলনায় মহাকাশে সেই ভ্রূণের বিকাশ অত্যন্ত নাজুক এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই গবেষণার প্রধান নিকোল ম্যাকফারসন, যিনি একজন প্রজনন জীববিজ্ঞানী, ব্যাখ্যা করেছেন, 'মহাকাশে দীর্ঘস্থায়ী বসতি গড়তে হলে বারবার পৃথিবী থেকে মানুষ পাঠানোর পরিবর্তে সেখানেই প্রজননের ব্যবস্থা করতে হবে। মহাকাশ বসতির স্বপ্ন এখন আর শুধু ভবিষ্যতের গল্প নয়, এটি বর্তমানের একটি জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
কীভাবে করা হলো এই গবেষণা?
নিকোল ম্যাকফারসন পূর্বে ডায়েট এবং স্থূলতা কীভাবে প্রজননে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে কাজ করতেন। ব্রিটিশ পদার্থবিদ ব্রায়ান কক্সের একটি মহাকাশ বিষয়ক ডকুমেন্টারি দেখার পর তাঁর মনে এই ধারণা আসে। এরপর ফায়ারফ্লাই বায়োটেক নামক একটি স্পেস মেডিসিন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার সহায়তায় তিনি একটি থ্রিডি ক্লিনোস্ট্যাট যন্ত্র সংগ্রহ করেন।
এই যন্ত্রটি একটি অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ, যা নমুনাগুলোকে দুটি অক্ষের চারপাশে ঘুরিয়ে মহাকাশের মতো মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এই যন্ত্রের ভেতরে গবেষকরা মানুষের, ইঁদুরের এবং শুকরের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিয়ে একটি কৃত্রিম প্রজনন নালি তৈরি করেন। ফলাফল ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর: কৃত্রিম মহাকাশ-পরিবেশে প্রায় ৩০ শতাংশ কম শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পেরেছে।
মাইক্রোগ্র্যাভিটির প্রভাব
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন যে শুক্রাণু রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে ডিম্বাণুর পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু নিকোল ম্যাকফারসন জানিয়েছেন যে এই প্রক্রিয়ার জন্য অভিকর্ষও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রাণু সাধারণত পৃষ্ঠতলের কাছাকাছি সাঁতার কাটতে পছন্দ করে, এবং পৃথিবীতে অভিকর্ষের কারণে তারা সহজেই পৃষ্ঠতলের দিক বুঝতে পারে।
কিন্তু মহাকাশে অভিকর্ষের অভাবে শুক্রাণুগুলো দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক মহাশূন্যে ভাসমান নভোচারীদের মতো। তারা বুঝতে পারে না কোথায় আছে বা কোন দিকে যেতে হবে, ফলে পথ হারিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, যেসব শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে, সেগুলো থেকে তৈরি ভ্রূণগুলোর গুণগত মান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত হ্রাস পায় এবং পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশে তৈরি ভ্রূণগুলোর তুলনায় তাদের বিকাশ পিছিয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের জন্য তাৎপর্য
এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট যে মহাকাশে মানুষের বসতি গড়া শুধু রকেট প্রযুক্তি বা প্রকৌশলের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আমাদের নিজেদের শরীর এবং জীববিজ্ঞানও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন মহাকাশে অত্যন্ত জটিল হতে পারে, এমনকি অসম্ভবও মনে হচ্ছে।
মহাকাশে মানবজাতির ভবিষ্যত এখনও অনিশ্চিত, কিন্তু এই গবেষণা আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বাধা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে, যাতে মহাকাশে মানব সভ্যতা স্থাপনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে।



