চাঁদ না থাকলে পৃথিবী কেমন হতো?
চাঁদ না থাকলে পৃথিবী কেমন হতো?

রাতের আকাশে চাঁদকে দেখা আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক যে, এটি ছাড়া আমাদের পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। সৃষ্টির পর থেকেই চাঁদ আমাদের রাতের আকাশকে আলোকিত করে আসছে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, যদি কোনোদিন চাঁদ না থাকত কিংবা আচমকা চাঁদ বিলীন হয়ে যেত, তবে কেমন হতো আমাদের চেনা এই পৃথিবী? বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে চলুন জেনে নেওয়া যাক চাঁদহীন পৃথিবীর রূপ কেমন হতো।

চাঁদের সৃষ্টি ও জোয়ার-ভাটার ওপর প্রভাব

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, মঙ্গলের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল, যা আকারে পৃথিবীর চেয়ে মাত্র ৩.৭ গুণ ছোট। চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর ওপর এর প্রথম প্রভাব পড়ত জোয়ার-ভাটায়। চাঁদের মহাকর্ষীয় বল না থাকলে সমুদ্রের জোয়ারের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ হতো এবং তখন জোয়ার-ভাটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হতো সূর্যের মাধ্যমে। এর ফলে প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে জোয়ার এবং ভাটা হতো।

দিনের দৈর্ঘ্য ও রাতের আকাশের পরিবর্তন

চাঁদ না থাকলে আমাদের চেনা দিনের দৈর্ঘ্যও বদলে যেত। চাঁদের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী আরও দ্রুত গতিতে ঘুরত, যার ফলে মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যেই একদিন শেষ হয়ে যেত! রাতের আকাশ হয়ে উঠত ঘুটঘুটে অন্ধকার। চাঁদের পর রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু হলো শুক্র গ্রহ, যা পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে ১৪ হাজার গুণ কম উজ্জ্বল। ফলে মনোরম জোছনার আলো আর কখনোই দেখা যেত না। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনাগুলোও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত। সে ক্ষেত্রে একটি ছোটখাটো গ্রহণ দেখতে শুক্র গ্রহের সূর্য-পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো, যা সর্বশেষ ২০১২ সালে হয়েছিল এবং ২১১৭ সালের আগে আর হবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জলবায়ু ও প্রাণীজগতের ওপর প্রভাব

চাঁদহীন পৃথিবী চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে পড়ত। চাঁদ পৃথিবীকে তার অক্ষে কিছুটা স্থিতিশীল রাখে। এটি না থাকলে সূর্যের আকর্ষণে পৃথিবী দুলতে থাকত, মেরু অঞ্চলের বরফস্তর অস্থিতিশীল হয়ে উঠত এবং জলবায়ুতে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটত। এমনকি বিষুবরেখ অঞ্চলের সমুদ্রের জলরাশি মেরু অঞ্চলের দিকে ধাবিত হতো, যা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জলবায়ু বদলে দিত। চাঁদের আলো না থাকলে নিশাচর প্রাণীদের রাতে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। টিকে থাকার লড়াইয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে তাদের আরও বড় ও সংবেদনশীল চোখ তৈরি করতে হতো। এ ছাড়া গ্রানিওন মাছের মতো অনেক জলজ প্রাণীর প্রজনন চক্র চাঁদের হিসাবের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় তাদের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। তবে নারীদের ঋতুচক্রের সঙ্গে চাঁদের চক্রের সময়ের মিল থাকাটা নেহাতই কাকতালীয়, এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

মানব ইতিহাস ও মহাকাশ গবেষণায় প্রভাব

চাঁদ না থাকলে মানব ইতিহাসের অনেক বড় বড় ঘটনাও ঘটত না। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘মহাকাশ প্রতিযোগিতা’ হতোই না। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে নীল আর্মস্ট্রংয়ের রাখা প্রথম মানুষের পায়ের ছাপের মতো ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে যেত। উল্কাপিণ্ডের আঘাত গবেষণার ক্ষেত্রেও চাঁদ আমাদের সাহায্য করে, যা থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম। আর যদি কোনোদিন কোনও গ্রহের সংঘর্ষে বা অন্য কোনও কারণে চাঁদ বিস্ফোরিত হয়, তবে তার ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর চারপাশে বলয় তৈরি করবে এবং বহু বছর ধরে সেই ধ্বংসাবশেষ উল্কার মতো পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

সূত্র: সায়েন্স ব্লগস, ফোর্বস, প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউট, সায়েন্স নরডিক