এলিয়েনরা কেন আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি? ফার্মি প্যারাডক্সের জবাব
এলিয়েনরা কেন যোগাযোগ করেনি? ফার্মি প্যারাডক্সের ব্যাখ্যা

কথা বলাই সবচেয়ে সহজ! ড্রেক সমীকরণের অন্য দিকটা নিয়েও আমার বেশ সন্দেহ আছে। সেখানে বলা হয়েছিল, মহাকাশে হয়তো আমাদের মতো বা আমাদের চেয়েও উন্নত লাখ লাখ ভিনগ্রহী আছে। যদি তা-ই সত্যি হয়, তাহলে এত দিনে আমাদের হাতে তাদের অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ চলে আসত।

গ্যালাক্সির বয়স ও প্রাণের সম্ভাবনা

মনে রাখবেন, গ্যালাক্সি শুধু বিশালই নয়, এটি বহু পুরোনোও বটে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বয়স অন্তত ১২০০ কোটি বছর। অথচ আমাদের সূর্যের বয়স মাত্র ৪৬০ কোটি বছর। এবার কল্পনা করুন, সূর্যের মতো কোনো একটি নক্ষত্র হয়তো সূর্যের মাত্র ১০ কোটি বছর আগেই তৈরি হয়েছিল। গ্যালাক্সির বিশাল বয়সের কাছে এই ১০ কোটি বছর তো এক ফোঁটা পানির মতো! তাহলে এটা কল্পনা করা মোটেও কঠিন নয় যে, মানুষের আবির্ভাবের কোটি কোটি বছর আগেই হয়তো কোনো ভিনগ্রহী সভ্যতার উত্থান হয়েছিল।

পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা

আমরা জানি, পৃথিবীতে প্রাণের শুরুটা বেশ সহজেই হয়েছিল। গ্রহাণু ও উল্কাপাতের সেই ভয়ংকর সময়টা পার হওয়ার পর পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ যখন প্রাণের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের জন্য শান্ত হলো, ঠিক তখনই প্রাণের শুরু হয়ে গেল। এটা খুব জোরালোভাবে প্রমাণ করে, সামান্যতম সুযোগ পেলেই প্রাণ নিজের শেকড় গেড়ে বসে। মানে, আমাদের গ্যালাক্সিতে প্রাণের প্রচুর প্রাচুর্য থাকার কথা। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় ও ভয়ংকর সব দুর্যোগ এসেছে। কিন্তু এসবের পরও প্রাণ এত দূর পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে। আমরা এখন বুদ্ধিমান, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং মহাকাশে ভ্রমণকারী এক প্রজাতি। একবার ভাবুন তো, আরও ১০ কোটি বছর পর আমরা কোথায় গিয়ে পৌঁছাব?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিনগ্রহীদের কাছ থেকে যোগাযোগের প্রত্যাশা

এই বিশাল সময় ও মহাকাশের বিস্তৃতির কথা চিন্তা করলে, এত দিনে সত্যিই কোনো ভিনগ্রহী প্রজাতির আমাদের দরজায় কড়া নাড়ার কথা ছিল! অন্তত তাদের একটা ফোন তো দেওয়া উচিত ছিল! বিশাল মহাকাশ পাড়ি দিয়ে সশরীরে আসার চেয়ে দূর থেকে যোগাযোগ করাটা তো অনেক সহজ। ১৯৩০-এর দশক থেকেই আমরা মহাকাশে বেতার সংকেত পাঠাচ্ছি। অবশ্য প্রথম দিকের সংকেতগুলো বেশ দুর্বল ছিল। কয়েক আলোকবর্ষ দূর থেকে কোনো ভিনগ্রহীর পক্ষে সেগুলো ধরতে পারা বেশ কঠিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী সংকেত মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়েছি। আমরা যদি নির্দিষ্ট কোনো নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে এমন সংকেত পাঠাতে চাই, তাহলে গ্যালাক্সির যেকোনো নক্ষত্রের দিকে সহজেই ধরা পড়ার মতো রেডিও সংকেত পাঠানো মোটেও কঠিন কিছু নয়।

SETI-এর প্রচেষ্টা

উল্টোটাও কিন্তু সত্যি। আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার খুব ইচ্ছা থাকলে কোনো ভিনগ্রহী জাতি খুব বেশি কষ্ট না করেই সেটা করতে পারত। সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সেটি (SETI) ঠিক এই ভরসাতেই কাজ করে যাচ্ছে। প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এই দলটি বেতার সংকেতের খোঁজে পুরো আকাশ তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। আক্ষরিক অর্থেই তারা ভিনগ্রহীদের কথা শোনার জন্য কান পেতে আছে। প্রযুক্তি এখন এতই উন্নত হচ্ছে যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেথ শোস্টাক অনুমান করছেন, আগামী দুই দশকের মধ্যেই আমরা পৃথিবীর এক হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা প্রায় ১০-২০ লাখ নক্ষত্রজগৎ পরীক্ষা করে দেখতে পারব। আমরা মহাবিশ্বে একা কি না, সেই রহস্য উন্মোচনে এটি অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।

যোগাযোগের একঘেয়েমি

তবে সেটির এই যোগাযোগের একটা বড় সমস্যা হলো, এই কথোপকথন বেশ একঘেয়ে বা বোরিং হতে পারে। ধরুন, আমরা গ্যালাকটিক স্কেলে খুব কাছের কোনো নক্ষত্র থেকে একটি সংকেত পেলাম। সেটা হয়তো এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এই যোগাযোগটা আসলে একতরফাই হবে। আমরা সংকেত পাব, তার উত্তর দেব এবং তাদের উত্তরের জন্য আমাদের আরও দুই হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে! আমাদের সংকেত তাদের কাছে পৌঁছাতে লাগবে এক হাজার বছর, আর তাদের উত্তর আবার আমাদের কাছে আসতে লাগবে আরও এক হাজার বছর। যদিও সেটির এই উদ্যোগটা দারুণ এবং সার্থক। তারা যদি সত্যিই কোনো সংকেত পেয়ে যায়, তাহলে তা হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। তবুও আমরা এখনো ভাবি, এলিয়েনরা সশরীরে পৃথিবীতে আসবে। একেবারে সামনাসামনি দেখা হবে! অবশ্য ধরে নিচ্ছি যে তাদের আমাদের মতো মুখমণ্ডল আছে।

দূরত্ব কি আসলেই বাধা?

কিন্তু এক হাজার আলোকবর্ষ তো অনেক দূরের পথ। প্রায় ৬০ লাখ কোটি মাইল! এটা বেশ লম্বা যাত্রা। তবুও আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বিশাল আকারের তুলনায় এটা বলতে গেলে ঘরের কাছের পথ। তাহলে এই দূরত্বের কারণেই কি তারা আমাদের কাছে আসেনি? দূরত্বটা কি আসলেই অনেক বেশি? আসলে তা নয়। আপনি যদি স্কেলের হিসাবটা ঠিক রাখেন, তাহলে অন্য নক্ষত্রে যেতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়।

চলবে…

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

টীকা: বর্তমানে ব্রেকথ্রু লিসেন নামে একটি বিশাল প্রজেক্টের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আরও ব্যাপকভাবে এলিয়েনদের সংকেত খুঁজছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মহাকাশের কোটি কোটি রেডিও সংকেত থেকে অস্বাভাবিক সংকেত আলাদা করার কাজ এখন অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে।