সুন্নি-শিয়া বিভাজনের পতন
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী সুন্নি-শিয়া বিভাজন ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে এবং এর পরিবর্তে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বার্থ ও বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকা নতুন বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা ছাতা’র কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ও বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলতে ইসরাইল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও মনে করছেন তারা।
সংঘাতের নতুন ব্যাখ্যা
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের সংঘাতকে বহু বছর ধরে মূলত সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় ইরাক ও ওমানও নেপথ্যে ভূমিকা রাখে।
গাজা যুদ্ধ ও নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
তাদের মতে, গাজা যুদ্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এর ফলে সৌদি আরব, ইরান, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে।
পাকিস্তানের ভূমিকা
এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘদিনের সৌদি মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসলামাবাদ একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই অবস্থান সৌদি আরবের বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি ও পাকিস্তানি নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। উপসাগরীয় দেশগুলো কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের পর অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
পাকিস্তান: সম্ভাব্য আঞ্চলিক ভারসাম্য
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে সম্ভাব্য আঞ্চলিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির বৃহৎ সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং পারমাণবিক সক্ষমতা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সেই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, ইসরায়িল ভেবেছিল তাদের পদক্ষেপ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াবে। কিন্তু তা উলটো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোকে নতুনভাবে একত্রিত হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে। এতে সুন্নি-শিয়া বিভাজনের চেয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের ভুল গণনা
এছাড়াও ইসরাইলের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই অনিচ্ছাকৃতভাবে নতুন এক আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের পথ খুলে দিয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর



