হরমুজ প্রণালি সংকট: ইরানে সরকার ও সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য বিভক্তি
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান সংকট যেন কাটছেই না। তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজনৈতিক শীর্ষনেতা ও সামরিক বাহিনীর কট্টরপন্থিদের মধ্যে স্পষ্ট বিভেদ দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
ঘোষণা ও পাল্টা ঘোষণার খেলা
গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেন। লেবাননের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই তিনি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এই ঘোষণা দেন। কিন্তু পরেরদিন শনিবার ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
প্রণালিটি পাড়ি দিতে যাওয়া দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালায় তারা, যা যুদ্ধবিরতির সময়ে হওয়া প্রথম এমন ঘটনা। একইসঙ্গে তারা নাবিকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা প্রচার করে জানায়, জলপথটি এখনও বন্ধ রয়েছে। ফলে যেসব জাহাজ ওই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, সেগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হয়। আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনও জাহাজ চলাচল করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
সরকার ও সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য বিভক্তি
ইরান সরকার ও সামরিক বাহিনীর এই প্রকাশ্য বিভক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কিছু ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছেন যা তাকে স্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করতে সহায়তা করবে।
মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে এবং ট্রাম্প দাবি করছেন, একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হতে পারে। কিন্তু, প্রণালিতে সাম্প্রতিক ঘটনাটি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। ইরানের যারা আপসের ইচ্ছে প্রকাশ করছেন, তারা হয়তো দেশটির নতুনভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা কট্টরপন্থিদের পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
ইরান বিশেষজ্ঞ এবং উইলসন সেন্টারের গ্লোবাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ আমেরসি বলেন, "পশ্চিমা বিশ্ব সাধারণত এমনভাবে আচরণ করছে যেন ইরান একটি স্পষ্ট কমান্ড চেইনযুক্ত দেশ—আপনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন, তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নেবে, সিদ্ধান্ত হবে—শেষ। কিন্তু, বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি উল্টো। চূড়ান্ত ফলাফল আসবে অস্ত্র, ড্রোন এবং দ্রুতগামী নৌযান যাদের হাতে রয়েছে তাদের থেকে। তারাই শেষ পর্যন্ত বিতর্কে জয়ী হয়।"
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, সর্বশেষ ঘটনাটি শুরু হয় গত শুক্রবার। ওই দিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে জানান, "হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত রয়েছে।" ইরানের দীর্ঘদিনের কূটনীতিক এবং আলোচনাকারী দলের তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী সদস্য আরাঘচির এই ঘোষণা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপসের প্রতি উন্মুক্ততার ইঙ্গিত দেওয়ার প্রচেষ্টা।
তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
আরাঘচির এই ঘোষণার ফলে তেলের দাম দ্রুত কমে যায় এবং ট্রাম্প সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এটির প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক মিকায়েল সিং বলেন, "আরঘচির এই বক্তব্যটি মূলত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছাড় যা লেবাননে যুদ্ধবিরতির পর এসেছে। এর মাধ্যমে ইরানের একটি চুক্তিতে আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।"
কিন্তু আরাঘচির এই উদ্যোগটি তাৎক্ষণিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। ঘোষণার রাতেই নিজেকে বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া একজন ব্যক্তি মেরিন রেডিওতে বার্তা প্রচার করে জানান, প্রণালিটি এখনও বন্ধ রয়েছে এবং জাহাজগুলোকে চলাচলের জন্য তাদের অনুমতি নিতে হবে। উপসাগরে থাকা জাহাজগুলোর ক্রুয়েরা ওই বার্তার রেকর্ডিং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে শেয়ার করেছে।
ওই রেকর্ডিং বার্তায় একজনকে বলতে শোনা যায়, "আমরা প্রণালি খুলবো আমাদের ইমাম খামেনির নির্দেশে, কোনও ইডিয়টের টুইটে নয়।" একজন ক্রু বলেন, "জাহাজগুলো ওই সতর্কবার্তা মেনে চলছিল।"
সামরিক বাহিনীর কঠোর অবস্থান
একই সময়ে আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত বার্তা সংস্থা তাসনিম আরাঘচির সমালোচনা করে। তারা বলে, "পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের যোগাযোগ পুনর্বিবেচনা করা উচিত।" ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কট্টরপন্থি সংসদ সদস্য মোর্তেজা মাহমুদি আরাঘচির অপসারণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "তার বক্তব্য তেলের দাম কমিয়ে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সুবিধা দিয়েছে।"
আর গতকাল শনিবার ইরানের যৌথ সামরিক বাহিনীর কমান্ড থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, তারা এমন প্রতিবেদন পেয়েছে যে ওমানের উপকূলে একটি ট্যাঙ্কারের কাছে বিপ্লবী গার্ডের গানবোটগুলো এসে গুলি চালায়। তবে, এতে কোনও আহতের ঘটনা ঘটেনি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউকেএমটিও আরও জানায়, তারা ওমানের কাছে একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার খবর পেয়েছে, যার ফলে কিছু কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরেকটি জাহাজ কাছাকাছি পানিতে একটি বিস্ফোরণ বা আঘাতের মতো স্প্ল্যাশ লক্ষ্য করার কথা জানিয়েছে বলে ইউকেএমটিও।
ওমান উপসাগরে থাকা একটি জাহাজের মালিক তার ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে একটি অডিও রেকর্ডিং পান। ওই রেকর্ডিংয়ে আইআরজিসির নৌবাহিনী জাহাজ মালিকদের সতর্ক করে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রম করার যেকোনো চেষ্টা কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে এবং ধ্বংস করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই জাহাজ মালিক বলেন, "আমরা সতর্কবার্তা অনুযায়ীই চলছি।"
অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ইঙ্গিত
তেহরানের আধাসামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, "আরাঘচি ঘোষণা দেওয়ার আগে বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করেনি। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে।" কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই গোষ্ঠী এখনও যুদ্ধের সময় তাদের ক্ষতির প্রতিশোধ নিতে চায় এবং মনে করে সামরিকভাবে তাদের অবস্থান এখন আরও শক্তিশালী।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুয়েন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সবিল স্টেটক্রাফট’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রিটা পার্সি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চুক্তির বিরুদ্ধে কট্টরপন্থিদের বিরোধিতা আরও জোরালো হয়েছে, যা একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।"
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলি ভেয়াজ আইআরজিসির পদক্ষেপকে ইরানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতিক্রিয়াকে হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই ধরনের যোগাযোগ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তেহরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের চেয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্রের একটি সত্যিকারের অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানের প্রতিফলন।"
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হরমুজ প্রণালির এই ঘটনাটি যুদ্ধের শুরুতে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার প্রতিধ্বনি বহন করে, যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশীদের ওপর হামলার জন্য ক্ষমা চান। বলেছিলেন, এই হামলাগুলো কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু, তাৎক্ষণিকভাবে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে তাকে চুপ করিয়ে দেয়। বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডাররা এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এমন দাবি অস্বীকার করেন এবং পরে হামলা অব্যাহত রাখে।
এই বিভক্তি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক গতিশীলতা যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত, এবং এই সংকটের সমাধান কেবল আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ শক্তি কাঠামোর সমন্বয়ের ওপরও নির্ভর করছে।



