যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ১৭ জুন ২০২৬-এর এই ছবি রয়টার্সের।
যুদ্ধের গতিপথ বদলে যায়
কথায় আছে, শত্রুর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো যুদ্ধই আর পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা, দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং হিজবুল্লাহ, হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের অবসান ঘটানো। ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত তাঁর এসব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে সরে যেতে হয়েছে এবং তিনি এমন অবস্থায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে ইরান কেবল তাঁকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও আলোচনা করবে।
সমঝোতা স্মারকের সীমাবদ্ধতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) এমনকি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে এমওইউতে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার উল্লেখ থাকায় হিজবুল্লাহ এটিকে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে উদ্যাপন করছে; যদিও ইসরায়েল এখনো লেবাননের একটি অংশকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে দখল করে রেখেছে।
হরমুজ প্রণালি: কৌশলগত সম্পদ
এ যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। নৌপথে বিশ্ববাণিজ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জলপথ। যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ শুরু করেছিল শাসনব্যবস্থার (ইরানের) স্থিতিশীলতা সম্পর্কে অবাস্তব মূল্যায়ন নিয়ে; পাশাপাশি তারা ইরানের হরমুজ প্রণালি দখল বা বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের স্থাপনায় তেহরানের আক্রমণ করার প্রস্তুতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।
বারবারা লিফ, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনৈতিক ফেলো, বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ শুরু করেছিল শাসনব্যবস্থার (ইরানের) স্থিতিশীলতা সম্পর্কে অবাস্তব মূল্যায়ন নিয়ে; পাশাপাশি তারা ইরানের হরমুজ প্রণালি দখল বা বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের স্থাপনায় তেহরানের আক্রমণ করার প্রস্তুতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।
যুদ্ধের পূর্বাভাস
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধ নিয়ে প্রায় সব কটি সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণে এ নিয়ে পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শুরু হলে ইরান খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এ প্রণালি আবার খুলে দিতে এখন ট্রাম্প প্রশাসনকে তাদের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো থেকে সরে আসতে বাধ্য হতে হয়েছে, নয়তো ট্রাম্পের ভাষায় একটি ‘বিশ্বব্যাপী মহামন্দা’ মোকাবিলা করতে হতো।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিধা
কয়েক দিন ধরেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে চায় না বা এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। অবশেষে গত বুধবার একজন মার্কিন ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা একটি ব্রিফিং কলে এটি পড়ে শোনান; যদিও হোয়াইট হাউস এখনো এর কোনো অনুলিপি অনলাইনে প্রকাশ করেনি।
বারবারা লিফ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বুঝতে পারে, তারা এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে, যারা চার দশক ধরে অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলে উন্নতি করেছে, দক্ষতা অর্জন করেছে। এমন প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি পরাজিত করার প্রস্তুতি তাদের ছিল না। অন্যদিকে যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও গিয়ে পড়ে। এতে তাদের কাছে যুদ্ধটি আরও বেশি অযৌক্তিক হয়ে ওঠে।
বারবারা লিফ বলেন, ট্রাম্প এখন একটি কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আবার যুদ্ধ শুরু করতে চান না। কিন্তু যুদ্ধ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে যে পরিমাণ কৌশলগত চাপ দেওয়ার সুযোগ বা সুবিধা তিনি পেতে পারতেন, তার অনেকটাই তিনি এরই মধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন।
চুক্তির সমালোচনা
এর কারণটিও স্পষ্ট। ট্রাম্পের নিজের দলের অনেকেই এই চুক্তিকে পছন্দ করছেন না। লুইজিয়ানার বিদায়ী মার্কিন সিনেটর বিল ক্যাসিডি এটিকে ‘গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। ক্যাসিডি লিখেছেন, ‘রিগ্যান কবরের ভেতরও এ নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছেন। ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং তারা শিখেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি খুবই কার্যকর। ভবিষ্যতেও তারা অবশ্যই এটিকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। এখন এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান নতুন করে সম্পূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও পাচ্ছে।’
নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, বুধবার প্রকাশিত ১৪ দফা তাঁর কাছে ‘একটি ভালো চুক্তি’ বলার জন্য যথেষ্ট মনে হয়নি।
ট্রাম্পের অবস্থান
ট্রাম্প বহু বছর ধরে বারাক ওবামার আমলে করা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনার (জেসিপিওএ) সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বলতেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে ঘুষ হিসেবে ‘বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ’ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যখন ট্রাম্পের নিজের ইরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের সময় এল, তখন তিনি নিজেকে এমন অবস্থানে পেলেন, যেখানে তাঁকে আরও অনেক বড় পরিসরের সম্পদের সম্ভাব্য হস্তান্তরকে যুক্তিসংগত বলে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আরও কিছু আর্থিক প্রণোদনা, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও ওমানকে আলোচনা করার অনুমতি দিতে হচ্ছে।
বিদেশের মাটিতে জব্দ করা ইরানি সম্পদ সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদেরই অর্থ এবং আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেটা স্থগিত করেছি। আমার মনে হয়, আমাদের এটা তাদের ফেরত দিতে হচ্ছে।’ বুধবার কিছু সময়ের জন্য তাই মনে হয়েছিল, ট্রাম্পের কণ্ঠে প্রায় ইরানের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি হচ্ছে। ট্রাম্প বলছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে সেই যুক্তিতে ইরানেরও সেগুলো থাকা উচিত।’
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটা একটু কঠিন বিষয়, যখন অন্য দেশগুলোর কাছে এটি আছে, আশপাশের দেশগুলোর কাছেও আছে। আর আপনি কেবল তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এ ধরনের লক্ষ্যে এটি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না। এখানে কিছুটা বাস্তব বুদ্ধি ব্যবহার করতে হবে।’
বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত
তবে যত কথাই বলা হোক, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। এর রাজনৈতিক মূল্য যা–ই হোক না কেন, সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। বারবারা লিফ বলেন, এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে দেখে তিনি গভীর স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না—এটা নিশ্চিত করার মতো নিশ্চয়তা এখানে খুব একটা নেই।
বারাক ওবামার আমলের জেসিপিওএ আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট ম্যালি লিখেছেন, এই দুই চুক্তির তুলনা করা খুব একটা অর্থবহ নয়। কারণ, এগুলো মৌলিকভাবে ভিন্ন দুটি চুক্তি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে হয়েছে। ম্যালি আরও লিখেছেন, ‘মূল কথা হলো, এই সমঝোতা স্মারক বর্তমানে যেকোনো বিকল্প প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।’ এই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘এটাই চূড়ান্ত কথা।’



