ইরানের যুদ্ধবিমানের অভাবনীয় সাফল্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যর্থতার প্রকাশ
ইরানের যুদ্ধবিমানের অভাবনীয় সাফল্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যর্থ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের শুরুর দিকেই এমন এক সামরিক ঘটনা ঘটেছে, যা গত সত্তর বছরে কোনও যুদ্ধবিমান করতে পারেনি। মার্কিন ও মিত্রশক্তির কয়েক স্তরের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কুয়েতের সুরক্ষিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সফলভাবে বোমাবর্ষণ করেছে একটি ইরানি যুদ্ধবিমান। পেন্টাগনের জন্য চরম অবমাননাকর এবং ইরানের নিজস্ব অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই অভিযানকে। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই হামলা চালালেও এটি প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সম্প্রতি সামনে আসতে শুরু করেছে।

কী ঘটেছিল

যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে বিশ্ব যখন ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলার খবরে ব্যস্ত ছিল, তখন এই অভাবনীয় ঘটনাটি অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কাছে কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে এটি এখন নিশ্চিত যে, কোরিয়ান যুদ্ধের পর এই প্রথম কোনও বিদেশি যুদ্ধবিমান মার্কিন কোনও বড় সামরিক ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করতে সক্ষম হলো। কোনও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে শনাক্ত করতে পারেনি।

কোথায় আঘাত হানে ইরান?

ইরানি হামলার শিকার এই ক্যাম্প বুহর্রিং ঘাঁটিটি কুয়েতের উত্তর-পশ্চিমে ইরাক সীমান্তের কাছে অবস্থিত। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মার্কিন সেনাদের প্রশিক্ষণ এবং রসদ সরবরাহের প্রধান গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত। হাজার হাজার সেনার আবাসস্থল এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জামের মজুত থাকা সত্ত্বেও এই ঘাঁটিটি ইরানের হামলার মুখে অরক্ষিত প্রমাণিত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কীভাবে চালানো হয় এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান

মার্চের শুরুতে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের একটি ঘাঁটি থেকে উড়েছিল একটি ইরানি যুদ্ধবিমান। বিমানটি ছিল নর্থরপ এফ-৫ প্ল্যাটফর্মের একটি উন্নত দেশীয় সংস্করণ। সেটি পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে কুয়েতের দিকে এগিয়ে যায়। বিমানটি ইরাক সীমান্তের কাছে অবস্থিত কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটি ক্যাম্প বুহর্রিং-এ প্রবেশ করে। সেখানে সফলভাবে সাধারণ বোমা নিক্ষেপ করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর নিরাপদে ইরানে ফিরে আসে।

কোন কৌশলে ফাঁকি দেয় ইরান

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ভাগ্য নয়, বরং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগানোর ফসল। ইরানি পাইলট ‘লো-অল্টিটিউড পেনিট্রেশন’ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। ভূমি বা পানির সমতল থেকে মাত্র কয়েক ডজন মিটার উঁচু দিয়ে ওড়ার কারণে বিমানটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যাটারি বা অন্যান্য রাডারের নজরে পড়েনি। পৃথিবী পৃষ্ঠের বক্রতা এবং ভূমি থেকে আসা সংকেত বিভ্রাট-এর কারণে রাডার দিগন্তের নিচে থাকা কোনও বস্তুকে শনাক্ত করতে পারে না, ইরান ঠিক এই সীমাবদ্ধতাকেই কাজে লাগিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পাল্টা আক্রমণের সময় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঝাঁকের মাধ্যমে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা হয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে যুদ্ধবিমানটি তার মিশন সম্পন্ন করে।

কোন যুদ্ধবিমান হামলা চালায়

পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক এফ-৫ প্ল্যাটফর্মকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ৭০-এর দশকের কোনও পুরোনো বিমান ছিল না। এটি ছিল ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হেসা কোসার। ১৯৮৭ সাল থেকে ইরান এফ-৫ টাইগার টু-এর রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করে। দীর্ঘ চার দশকের প্রচেষ্টায় আজ তারা ৮৮ শতাংশ দেশীয় যন্ত্রাংশ দিয়ে এই বিমান তৈরি করছে। কোসারে রয়েছে, আধুনিক ডিজিটাল ককপিট এবং হেড-আপ ডিসপ্লে, মাল্টি-পারপাস ফায়ার কন্ট্রোল রাডার, লেজার জিপিএস এবং ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম, দুটি ইরানি টার্বোজেট ইঞ্জিন, যা জেনারেল ইলেকট্রিক জে-৮৫-এর উন্নত সংস্করণ এবং এটি সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় এবং ১.৫ ম্যাক গতিতে উড়তে সক্ষম।

কৌশলগত তাৎপর্য

১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর কোরিয়ার একটি নৈশ অভিযানের পর এই প্রথম কোনও শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান সফলভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করলো। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ধরে নিয়েছিল যে তাদের আকাশসীমা অভেদ্য। কিন্তু ইরানের এই হামলা সেই দম্ভ চূর্ণ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানি বিমান বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু কোসার-এর এই অভিযান প্রমাণ করেছে যে ইরানের বিমান শক্তি কেবল কার্যকরই নয়, বরং তারা মার্কিন সামরিক শক্তির হৃদপিণ্ডে আঘাত হানার সামর্থ্য রাখে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাতটি দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের এই সম্মিলিত হামলায় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। হ্যাঙ্গার, কমান্ড হেডকোয়ার্টার এবং অসংখ্য স্যাটেলাইট যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। তবে ভৌত ক্ষতির চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক আঘাতটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: প্রেস টিভি