জামিল আহমেদ লিমনের মৃত্যুর খবরে গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মোখলেছুর রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকে অপেক্ষায় ছিলাম—হয়তো লিমনের খোঁজ পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন খবর পেয়ে মন ভেঙে গেছে। লিমন লাশ হয়ে ফিরবে—এমনটা আশা করিনি। এখন শুধু মনে হচ্ছে, আমাদের একটা সর্বনাশ হয়ে গেল।'
শিক্ষার্থী হিসেবে লিমনের মেধার স্বাক্ষর
জামিল আহমেদ (২৭) যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জে। বাবা জহুরুল হক গাজীপুরের শ্রীপুরের প্যারাডাইস স্পিনিং কারখানায় চাকরি করতেন। সেই সুবাদে লিমন সেখানকার মাওনা জে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে মাওনা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ২০১৪ সালে তিনি ওই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। শিক্ষক মোখলেছুর রহমান বলেন, 'লিমন নিখোঁজ হওয়ার পর তার এক বন্ধুর কাছ থেকে খবর পাই। সে পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিল। প্রতিটি পরীক্ষায় সে মেধার স্বাক্ষর রেখেছিল।'
শৈশবের শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া
আজ রোববার দুপুরে কথা হয় জামিলের শৈশবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে জামিলের মৃত্যুর খবর পান। আবদুল হালিম বলেন, 'অনেক কঠিন কষ্টের একটা খবর পেয়েছি। মনটা খারাপ হয়ে গেল। লিমন ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিল। মেধাবী একটা ছেলের এমন পরিণতি খুব কষ্টকর।'
সহপাঠীদের স্মৃতিচারণ
জামিল আহমেদ ২০২২ সালে সহপাঠীদের সঙ্গে শ্রীপুরের সি-গাল রিসোর্টে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। নিহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে তাঁর সাত বছরের সহপাঠী তৈহিদুর রহমান (অনিক) বলেন, 'তৃতীয় শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সহপাঠী ছিলাম। ২০২২ সালে আমাদের ব্যাচের সবাইকে নিয়ে পুনর্মিলনী হয়েছিল। সেখানে অনেক দিন পর লিমনের সঙ্গে দেখা হয়। বন্ধুকে কাছে পেয়ে অনেক আলাপ হয়ে। পরে আরও কয়েকবার কথা হয়েছে। লিমন নিখোঁজ হওয়ার পর এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর পাই। তখন থেকেই আমার মন খারাপ। এরপর যখন তার মৃত্যুর সংবাদ শুনলাম, রাতে ঘুম আসেনি। আমরা যারা তার সঙ্গে পড়াশোনা করেছি, তারা এই খবরে ব্যথিত হয়েছি। তার এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন।'
শোকার্ত পরিবার ও বিচার দাবি
নিহত জামিল আহমেদের বাবা জহুরুল হকের সঙ্গে বেলা দুইটার দিকে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, 'আমার তো এখন সব শেষ হয়ে গেল। আমরা এখন ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সবার জন্য দোয়া করবেন, সহযোগিতা করবেন।'
মরদেহ উদ্ধার ও তদন্তের অগ্রগতি
জামিল আহমেদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ গত শুক্রবার উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফ্লোরিডার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে নিখোঁজ বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির (২৭) মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর মরদেহ খুঁজে পেতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টি পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। জামিল ও বৃষ্টিকে সবশেষ ১৬ এপ্রিল টাম্পায় দেখা গিয়েছিল। তাঁদের খোঁজ না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ ডায়েরি হয়।
গ্রেপ্তার ও অভিযোগ
জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ-মৃত্যুর ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের এক মার্কিন যুবককে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে কিংবা তাঁদের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তদন্তকারীরা।



