রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেন, রুশ সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন অগ্রগতি অর্জন করছে। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, কিয়েভ যদি আপস করতে প্রস্তুত থাকে, তবেই কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা যুদ্ধ থামাতে পারবে।
রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপকালে পুতিন এ কথা বলেন। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে যুদ্ধ অবসানে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান জেলেনস্কি। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো সমঝোতা না হলে কিয়েভ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পুতিন ওই বার্তার কথা জানেন, তবে এখনো চিঠির বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ পাননি। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক হলে তা ‘দারুণ’ হবে।
যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। পুতিন বলেছেন, জনশক্তি, শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকে রাশিয়া এগিয়ে আছে। তিনি দাবি করেন, রুশ সেনাবাহিনী সম্প্রতি প্রায় আড়াই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান হামলা মোকাবিলায় মস্কোকে তার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং তারা তা করবে।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু সামরিক বিশ্লেষক এবং ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার অগ্রসর হওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। তাঁদের মতে, রাশিয়া এখনো তাদের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন থেকে অনেক দূরে আছে।
পুতিনের আত্মবিশ্বাস
তা সত্ত্বেও পুতিনের কণ্ঠে শোনা গেল আত্মবিশ্বাসের সুর। তিনি বলেন, ‘অভিযান প্রতিদিনই চলছে। বর্তমানে রুশ ফেডারেশন লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এ ছাড়া দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিকের ৮৫ শতাংশের বেশি এলাকা ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের ৮০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে।’
পুতিন বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনীয় পক্ষ চাইবে, আমরা আমাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিই। কিন্তু সেটি থামানোর চেয়ে (আলাস্কার) অ্যাঙ্কোরেজে যে সমঝোতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেগুলোতে সম্মত হয়ে পুরো যুদ্ধের অবসান ঘটানোই বেশি ভালো হবে।’
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের শীর্ষ বৈঠক হয়। সে বৈঠকে হওয়া সমঝোতার কথাই উল্লেখ করেছেন পুতিন। এটিকে মূলত মস্কোর সে দাবির প্রতি ইঙ্গিত বলে মনে হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া চাইছে, ইউক্রেন তার পূর্বদিকের দনবাস অঞ্চলের বাকি অংশও ছেড়ে দিক। রাশিয়া যে চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে, তার দুটির সম্পূর্ণ এলাকা এ দনবাসের অন্তর্ভুক্ত।
জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হাজার হাজার মানুষের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলবে। এতে ইউক্রেনের অবশিষ্ট অংশও রুশ হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। পুতিন বলেছেন, কিয়েভকে শেষ পর্যন্ত আপস করতেই হবে। রুশ প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি বুঝতে পারছেন যে বর্তমানে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এমন অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের প্রভাব ব্যবহার করে ইউক্রেনকে সমঝোতায় রাজি করাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নিজের খোলা চিঠিতে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মূলত পুতিনেরই। জেলেনস্কি দাবি করেন, ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এবং রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি-সংকটে দেশটির জনগণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এবং তাঁরা শান্তি চান। জেলেনস্কি আরও সতর্ক করে বলেন, পুতিন যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেন, তবে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।



