পুতিনের ভাবমূর্তি পরিবর্তন: কেজিবি কর্মকর্তা থেকে কর্তৃত্ববাদী নেতা
পুতিনের ভাবমূর্তি পরিবর্তন: কেজিবি থেকে কর্তৃত্ববাদী নেতা

ভ্লাদিমির পুতিন বিভিন্ন সময়ে তাঁর রূপ পাল্টেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পুরো সময় ভ্লাদিমির পুতিন ভিডিও চিত্রের শক্তি সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন থেকেছেন। বিবিসির সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডালের বর্ণনা থেকে তেমনটা বোঝা যায়। কেন্ডাল ২০০১ সালে প্রথমবার পুতিনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ওই সময়ের কথা বর্ণনা করে এক সাংবাদিক বলেন, ক্যামেরা চালু হওয়ার ঠিক আগে একজন সহকারী দ্রুত এসে তাঁদের সামনে থাকা টেবিলের ওপর থেকে ছোট পানির গ্লাসগুলো সরিয়ে নিয়ে যান। কেন্ডাল তখন পুতিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এটা কেন করলেন?’ জবাবে পুতিন বলেছিলেন, ‘আমরা চাই না কেউ এগুলোকে ভদকার গ্লাস মনে করুক। তা ছাড়া সরাসরি সম্প্রচারের সময় কোনো গ্লাস উল্টে গিয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও নিতে পারি না। প্রচারের ক্ষেত্রে টেলিভিশন যেন একধরনের পারমাণবিক বোমা।’

টেলিভিশনের ক্ষমতা ও পুতিনের উপলব্ধি

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরানৎসেভ বলেন, ‘রাশিয়ার সবাই, বিশেষ করে পুতিন বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতা সুসংহত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল টেলিভিশন।’ বছরের পর বছর ধরে পুতিন রাশিয়াকে একটি নাজুক উদীয়মান গণতন্ত্র থেকে অনেকটাই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকেও নাটকীয়ভাবে বদলে ফেলেছেন। শুরুর দিকে তোলা ছবিগুলোতে পুতিনকে রোগা-পাতলা এবং সংযত একজন মানুষ হিসেবে দেখা যেত। তিনি তখন ক্যামেরার সামনে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতেন এবং সতর্ক থাকতেন। তাহলে এই শান্ত ও অন্তর্মুখী স্বভাবের এ মানুষটি কীভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাওয়া প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠলেন?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছবির প্রতি আগ্রহ ও কেজিবি জীবন

টেলিভিশনের সৃষ্টিক্ষমতায় আসার বহু আগেই পুতিন ছবির শক্তি সম্পর্কে গভীর আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বেড়ে ওঠা বেশির ভাগ তরুণের মতো তিনিও ছিলেন টেলিভিশন যুগের সন্তান। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ও চলচ্চিত্রের গুপ্তচর নায়কেরা তাঁর আদর্শ ছিলেন। পুতিন নিজেই স্বীকার করেছেন, সোভিয়েত রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এসব দৃঢ়চেতা, স্বল্পভাষী গুপ্তচরই তাঁকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে কর্মজীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল। কেজিবির একজন কর্মকর্তা এবং পরে একজন নিষ্ঠাবান দলীয় আমলা হিসেবে তিনি সব সময় প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে তিনি হঠাৎ করেই দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান এবং কয়েক মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি এবং তাঁর জনসংযোগ পরামর্শকেরা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তি গঠনে ছবির গুরুত্ব কতটা গভীর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভাবমূর্তি নির্মাণ ও মদ্যপান সংক্রান্ত কৌশল

ভাবমূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় সহায়ক ছিল না, সেগুলো আড়াল করা হতো। জনসাধারণের কাছে পুতিন অনেকটা মদ্যপান না করা একজন ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকা মানুষদের ভালো মানের ওয়াইন পরিবেশন করা হতো। তবে পুতিন সাধারণত মধু মেশানো এক কাপ চা পান করেই সন্তুষ্ট থাকতেন। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে তিনি মদ্যপান করলেও তাঁর সহযোগীরা বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করতেন। টাইম ম্যাগাজিনের জন্য ২০০৭ সালে পুতিনের ছবি তোলা আলোকচিত্রী প্লাটন বলেন, ‘ছবি তোলার সময় পুতিন নিজেকে একজন ক্ষমতাবান নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। যত দূর জানি, তিনি এসব ছবি পছন্দ করেন। তাঁর সমর্থকদের কাছেও ছবিগুলো জনপ্রিয়। কারণ, এগুলো তাঁকে একজন কঠোর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরে।’

গোপনীয়তা ও ভয়ের পরিবেশ

একবার রাশিয়ার স্থানীয় জাদুঘরের এক তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে বিবিসির সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডালের দেখা হয়। ওই তত্ত্বাবধায়ক কেন্ডালকে বলেছিলেন, তিনি একদিন প্রেসিডেন্টের (পুতিন) সঙ্গে বসে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার প্যানকেক খেয়েছিলেন। স্বাদ বাড়ানোর জন্য এর ওপর সামান্য ভদকা মাখানো ছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ওই ব্যক্তি কেন্ডালকে অনুরোধ করেন, ‘দয়া করে কাউকে বলবেন না। এ ব্যাপারে তারা খুব কঠোর। বিষয়টি জানাজানি হলে আমি ভয়ংকর বিপদে পড়তে পারি।’ এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় কাজ করেছিল। সেটি হলো জনগণকে স্পষ্টভাবে এই বার্তা দেওয়া যে তিনি তাঁর পূর্বসূরি বোরিস ইয়েলৎসিনের মতো নন। কারণ, বোরিস ইয়েলৎসিনের মদ্যপান জনসমক্ষে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করত। বিপরীতে পুতিন নিজেকে একজন কর্মক্ষম, সুস্থ ও সক্রিয় মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে নানা ধরনের প্রচারণামূলক চিত্রে হাজির হন। তিনি কখনো যুদ্ধবিমান চালাতে পাইলটের হেলমেট পরেন, কখনো জুডোতে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এসবই ছিল এমন এক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা যে তিনি একজন উদ্যমী ও শক্তিশালী মানুষ।

প্রচারণামূলক চিত্র ও বিতর্ক

সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০০৭ সাল থেকে প্রকাশিত একাধিক ছবি। এসব ছবিতে তাঁকে খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়তে দেখা যায়। আবার কোথাও তাঁকে নদীতে মাছ ধরতে বা শক্তিশালী ভঙ্গিতে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, এসব কি বাস্তব ছিল, নাকি এর মধ্যে একধরনের ইচ্ছাকৃত নাটকীয়তা ও ব্যঙ্গের উপাদান ছিল? বিশেষজ্ঞ পোমেরানৎসেভের মতে, তাঁর জনসংযোগ দলের মানুষেরা খুব ভালোভাবেই জানতেন, তাঁরা কী করছেন।

নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন

পুতিনের পুরোনো ছবিগুলো ইঙ্গিত দেয়, তাঁর শান্ত মুখাবয়বের আড়ালে ছিল কঠোর সংকল্প। কেজিবি কর্মকর্তার ভূমিকার জন্য উপযুক্ত এই সংযত স্বভাব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও শাণিত হয়েছিল। তিনি এমন এক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি সহজেই ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারতেন এবং নজরের বাইরে থাকতে পারতেন। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একজন বিশ্বস্ত ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পুতিন নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। প্রথমে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অধীনে কাজ করেন। পরে মস্কোয় গিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনে যোগ দেন। সেই সময়কার ছবিগুলোতে দেখা যায়, পুতিন সাধারণত ছবির পেছনে বা এক পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনোই ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছেন না, আবার কেন্দ্রবিন্দুতেও নেই। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের প্রপৌত্রী নিনা ক্রুশ্চেভ বলেন, ১৯৯০-এর দশকে তিনি শুনেছিলেন, কেজিবি মহলে পুতিনকে ‘মথ’ নামে ডাকা হতো। কারণ, তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি চাইলে যেকোনো জায়গায় নিজেকে আড়াল করতে পারেন, ছায়ার আড়ালে থাকতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিবর্তন

পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি নিজেকে নানা চরিত্রে উপস্থাপনের সুযোগ উপভোগ করছেন। এর কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে টাইম সাময়িকীর বর্ষসেরা ব্যক্তি হওয়ার পর পুতিনের ছবি তোলা হয়। সে ছবিতে দেখা যায়, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন এবং সরাসরি ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে আছেন। সে ছবিতে তাঁকে সিংহাসনে বসা কোনো জার, অথবা ভয়ংকর কোনো মাফিয়া প্রধানের মতো দেখাচ্ছিল। টাইম সাময়িকীর জন্য ২০০৭ সালে পুতিনের ছবি তোলা আলোকচিত্রী প্লাটন বলেন, ‘ছবি তোলার সময় পুতিন নিজেকে একজন ক্ষমতাবান নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। যত দূর জানি, তিনি এসব ছবি পছন্দ করেন। তাঁর সমর্থকদের কাছেও ছবিগুলো জনপ্রিয়। কারণ, এগুলো তাঁকে একজন কঠোর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরে।’

কর্তৃত্ববাদী প্রচারের আধুনিক রূপ

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার পোমেরানৎসেভের মতে, পুতিনের বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপনের বিষয়টি ‘কর্তৃত্ববাদী প্রচারের এক আধুনিক রূপ’। বিশ্লেষকদের মতে, একজন শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা পুতিনের নীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। রাশিয়াকে আবার শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে আরও শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে তিনি যুক্তি দেন। এরপর ধাপে ধাপে পুতিন রুশ সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। মতপ্রকাশ ও সমালোচনার পরিসর সংকুচিত করা হয়, পার্লামেন্টের স্বাধীন ভূমিকা কমে আসে, রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রভাব সীমিত করা হয় বা তাঁদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাশিয়াকে যথাযথ সম্মান না দেখানোর অভিযোগ তুলে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও বাড়িয়ে দেন পুতিন।

মুখোশের আড়ালের মানুষ

পুতিনের খালি গায়ে তোলা তথাকথিত ‘অতি পৌরুষপূর্ণ’ ছবিগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে এসব ছবি হয়তো তাঁর অনিশ্চয়তার দিকটিও প্রকাশ করে। সমালোচকদের মতে, তিনি যেন অন্যদের পাশাপাশি নিজেকেও বোঝাতে চাইছিলেন, তিনিই এখনো দেশের প্রধান নেতা এবং আগের মতোই সুস্থ ও শক্তিশালী। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর এমন দৃষ্টি আকর্ষণকারী ছবিগুলো প্রকাশ হতে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ছবি একটি বার্তাও দিচ্ছিল। সেটি হলো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নয়, প্রকৃত ক্ষমতা এখনো পুতিনের হাতেই আছে।

চেহারায় পরিবর্তন ও কান্নার ঘটনা

২০১১ সালে পুতিনের চেহারায় হঠাৎ একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। জনসমক্ষে তিনি আগের তুলনায় আরও গুরুগম্ভীর মুখ নিয়ে হাজির হন। তাঁর চেহারা থেকে অভিব্যক্তি হারিয়ে যায়। পুতিনের ওই চেহারা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়। কেউ প্রশ্ন তোলেন এটি কি কোনো রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহারের ফল? আবার কেউ প্রশ্ন তোলেন, বয়সের ছাপ আড়াল করতে কি তিনি বোটক্সের আশ্রয় নিয়েছেন? এর কয়েক মাস পর পুতিন আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের ফল নিয়ে তেমন কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। তবে বিজয় ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে পুতিনের চোখে পানি দেখা যায়। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সেই দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিবিসির সাংবাদিক ব্রিজেট কেন্ডালের দৃষ্টিতে পুতিনের সে কান্না ছিল সত্যিকারের। আবেগের কারণে তাঁর কণ্ঠও ভারী হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের আগে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও সবকিছু পরিকল্পনামতো হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন বলেই মনে হচ্ছিল। ওই বিক্ষোভগুলোতে কিছু মানুষ সাহস করে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগানও দিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক প্রদর্শন নাকি প্রকৃত আবেগ?

তবে কিছু বিশ্লেষক ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, এটিও হয়তো সুচিন্তিত একটি রাজনৈতিক প্রদর্শন ছিল। এর মাধ্যমে অশ্রুসিক্ত এক নেতার ভাবমূর্তি তৈরি করে নিজেকে রাশিয়ার ত্রাণকর্তা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন পুতিন। ঘটনাটি যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটি ছিল পুতিনের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এর আগের কয়েক বছর ধরে তিনি দেশের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছিলেন। এর পর থেকে রাশিয়ায় ভিন্নমত প্রকাশকে শুধু নিরুৎসাহিতই করা হয়নি, অনেক ক্ষেত্রেই তা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই সময়ের পর পুতিন আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। রাশিয়ায় বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা ক্রমেই কমতে থাকে।

বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ

এখন ভ্লাদিমির পুতিনের বয়স ৭৩ বছর। তবে আগের তুলনায় তাঁকে এখন অনেক কমই প্রকাশ্যে দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে তিনি আরও বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন। এখন তিনি যখন ক্যামেরার সামনে আসেন, তখন সেগুলো খুব পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সাজানো থাকে, যেন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বজায় রাখা হয়। মার্কিন বিশ্লেষক ফিওনা হিল মনে করেন, মানুষ যেন পুতিনের গতিবিধি সহজে অনুসরণ করতে না পারে, তা তিনি নিশ্চিত করতে চান। এতে বোঝা যায়, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ও সন্দেহপ্রবণ। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ তাঁর ভাবমূর্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখন তাঁর জন্য একধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, তেমনি তা শেষ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, পুতিন এমন একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধযন্ত্র এবং কঠোর দমন-পীড়নের ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যেখান থেকে সরে এলে তাঁর নিজের জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এখন যেন তিনি নিজেরই তৈরি করা এক ফাঁদে আটকে গেছেন। একসময় তাঁর যে ক্রীড়াবিদ ও অ্যাকশন-হিরোর ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা ছিল, তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র এটি।