ইরানের কাছে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ তেহরানকে নিজের কাছে রাখতে দেওয়া হবে না বলে বৃহস্পতিবার আবারও জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই দিনে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক নির্দেশনা জারি করে বলেছেন, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না।
বর্তমানে ইরানের কাছে আনুমানিক ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশের চেয়ে কম হলেও, এই স্তর থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছানো অনেক দ্রুত ও সহজ হয়।
ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে ট্রাম্প ও খামেনির বক্তব্য
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা এটি নিয়ে নেব। আমাদের এটি প্রয়োজন নেই, আমরা এটি চাইও না। পাওয়ার পর আমরা সম্ভবত এটি ধ্বংস করে ফেলব, কিন্তু তাদের কাছে এটি রাখতে দেব না। একই দিনে রয়টার্স ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানায়, ট্রাম্প ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছেন যে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ দেশের বাইরে পাঠানো হবে এবং যেকোনও শান্তি চুক্তিতে এই শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা এবং প্রশাসনের মধ্যকার ঐকমত্য হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কোনোভাবেই দেশের বাইরে যাবে না।
ইরানের ইউরেনিয়াম ও পারমাণবিক কর্মসূচি
তেহরান বছরের পর বছর ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। ২০১৫ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি (জেসিপিওএ) সই করেছিল ইরান। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা ইরানের চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি প্রত্যাহার এবং ২০২১ সালে ইরানের নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলার পর, যার জন্য ইরান ইসরায়েলকে দায়ী করে, তেহরান পারমাণবিক বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্য ২০১৫ সালের চুক্তিতে অনুমোদিত ৩.৬৭ শতাংশের সীমা লঙ্ঘন করে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি গত মার্চের শুরুতে আল জাজিরাকে বলেছিলেন, তাত্ত্বিকভাবে এই পরিমাণ ইউরেনিয়ামকে যদি ৯০ শতাংশে সমৃদ্ধ করা হয়, তবে তা ১০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির জন্য যথেষ্ট।
তবে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের সমর্থন বন্ধ এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না।
শান্তি আলোচনা কি কারণে অচলাবস্থায়
যুক্তরাষ্ট্র এই মজুদ নিজেদের হাতে নিতে চায়, তবে ইরান এটি কেবল কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বিবেচনা করতে রাজি ছিল। কিন্তু বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এটি স্থানান্তরের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচি সাংবাদিকদের বলেন, ইউরেনিয়াম মজুদের ইস্যুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অচলাবস্থায়’ পৌঁছেছে। ফলে এই বিষয়টি আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইউরেনিয়াম স্থানান্তর কি নিরাপদ
ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড গ্যাস অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে মারাত্মক বিষাক্ত ও ক্ষয়কারী ফ্লোরাইড যৌগ তৈরি করে, যা শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে এবং ত্বক পুড়িয়ে দিতে পারে। আইএইএ-এর প্রোটোকল অনুযায়ী, এই গ্যাসকে বিশেষভাবে তৈরি ফোর্টিফাইড স্টিল সিলিন্ডারে পরিবহন করতে হয়, যা উচ্চ চাপ ও তাপ সহ্য করতে পারে।
অতীতেও এমন পারমাণবিক উপাদান স্থানান্তরের নজির রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কানাডায় উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রফতানি করত, যা ২০২১ সালে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৯৪ সালে ‘প্রজেক্ট স্যাফায়ার’ নামক একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী কাজাখস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেখে যাওয়া প্রায় ৬০০ কেজি (১,৩২৩ পাউন্ড) অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম নিরাপদে বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছিল।
সূত্র: আল জাজিরা



