সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে বন্দুক হামলা: শোক ও ঐক্যের গল্প
সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে বন্দুক হামলা: শোক ও ঐক্য

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগোতে অবস্থিত ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো কমপ্লেক্সে গত সোমবার (১৮ মে) এক বন্দুক হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় সেখানে ১৪০ জন শিশু ও কর্মী উপস্থিত ছিলেন। কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ’ হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত করছে।

হামলার বিবরণ

সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে নাওয়াল আল-নুরির ফোনে সাত বছরের মেয়ের স্কুল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা আসে। বার্তায় জানানো হয়, স্কুলে একজন বন্দুকধারী হামলা চালিয়েছে। নাওয়ালের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তাঁর স্বামী ওমর আল-নুরি পাশের শহর লা জোলার একজন ভাস্কুলার সার্জন। তিনিও একই বার্তা পেয়ে দ্রুত স্কুলের দিকে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি চারদিকে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স আর আতঙ্কিত মানুষ দেখতে পান। ওমর বিবিসিকে বলেন, ‘আমি এখনো মানসিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারিনি। বারবার চোখের সামনে একই দৃশ্য ভেসে ওঠে, বন্দুকধারীরা স্কুলে ঢুকছে, আর শিশুরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটছে।’

নিহত ব্যক্তিরা

নিহত তিনজন হলেন নিরাপত্তা প্রহরী আমিন আবদুল্লাহ, স্কুলের এক শিক্ষিকার স্বামী নাদির আওয়াদ এবং দোকানি মনসুর কাজিহা। হামলার পর সন্দেহভাজন দুই বন্দুকধারীর গাড়ি ঘিরে ফেলা হয়। তখন একজন অন্যজনকে গুলি করে। পরে সে আত্মহত্যা করে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী দুই তরুণের বয়স ১৭ ও ১৮ বছর। তারা অনলাইনে উগ্রবাদে প্রভাবিত হয়েছিল। তাদের লেখালেখিতে ইসলামবিদ্বেষ, ইহুদিবিদ্বেষ ও নারীবিদ্বেষের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এফবিআই তিনটি বাড়ি থেকে ৩০টি বন্দুক ও একটি ক্রসবো উদ্ধার করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

এই হামলা শুধু তিনজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি। এটি সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়কে গভীর শোক, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই ঘটনায় একই সঙ্গে তাঁদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার নিহত ব্যক্তিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজারো মানুষ। মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানাতে সেখানে বিপুল পরিমাণ অমুসলিমরাও উপস্থিত হয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ারের সান ডিয়েগো শাখার নেতা তাজীন নিজাম বলেন, ‘আপনাকে হয়তো সব সময় ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়। একদিন কিছু একটা ঘটতে পারে, এমন ভয় আপনাকে তাড়া করে। কিন্তু সত্যিই যখন তা ঘটে, তখন সেটি মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।’

স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ রহমানের দুই সন্তানও এই স্কুলে পড়ে। হামলার সময় শিশুরা খেলার মাঠে ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে শিশুরা বেঁচে গেছে।’

নিরাপত্তা প্রহরীর ভূমিকা

হামলার পর কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহকে অনেকে ‘বীর’ হিসেবে দেখছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, তিনি দ্রুত লকডাউন ঘোষণা করেন এবং বন্দুকধারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর মেয়ে হাওয়া আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমার বাবা সব সময় চাইতেন মানুষ একসঙ্গে থাকুক। তিনি চাইতেন আমরা আরও ভালো মানুষ হই।’

রাজনৈতিক প্রভাব

মুসলিম লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ তাহিরি বলেন, এমন ঘটনায় তিনি বিস্মিত হননি। তবে আতঙ্কিত। তাহিরির মতে, মুসলিমবিদ্বেষকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যখন মুসলিমদের সন্দেহের চোখে দেখান, তখন সেটি বাস্তব জীবনের সহিংসতার পথ তৈরি করে দেয়। ...যাই হোক আমরা ভেঙে পড়ব না। আমরা শোক পালন করব। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকব।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কেন্দ্রের ইমাম সাদ এলদেগেউই বলেন, এটি শুধু মুসলিমদের জনপরিসর নয়। এই কেন্দ্র পুরো সমাজের জন্য কাজ করে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভালোবাসা ছড়াতে এসেছি। বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আমরা আইনি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে লড়াই চালিয়ে যাব।’ হামলার দুই দিন পর মসজিদটি নামাজের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল ও কেন্দ্রের অন্যান্য অংশ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের গেটের সামনে এখন একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ফুল, মোমবাতি আর হাতে লেখা বার্তা রেখে যাচ্ছেন শোকসন্তপ্ত মানুষ।

নাওয়াল ও ওমর আল-নুরি এখনো মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। হামলার পাঁচ ঘণ্টা পর তাঁরা তাঁদের মেয়ে মায়ার সঙ্গে দেখা করেন। মায়া ও তার সহপাঠীরা আগে থেকে শেখানো নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে ক্লাসরুমে লুকিয়ে ছিল। পরে পুলিশ তাদের নিরাপদে বের করে আনে। ওমর বলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। কিন্তু এখন আমার সবচেয়ে বড় ভয়, সে স্কুল বা মসজিদে যেতে যেন আবার ভয় না পায়।’