ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া তরুণ আমাল সাহেলের (ছদ্মনাম) জীবনের চারটি মৃত্যু-মুহূর্তের মধ্যে প্রথমটি ঘটে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫ বছর। একদিন তিনি ও তাঁর বন্ধুরা রাস্তায় পড়ে থাকা একটি লম্বা ধাতব টুকরা কুড়িয়ে পান, যা তারা তলোয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। সাহেলের ভাষায়, ‘আমরা জানতাম না যে এগুলো বিপজ্জনক এবং আমাদের কাছে এগুলো স্রেফ অদ্ভুত জিনিস বলেই মনে হতো।’ এক বন্ধু সেটি বাতাসে ঘোরাচ্ছিল, আর সাহেল বক্সিং প্রশিক্ষণের জন্য জিমে চলে যান। কিছুক্ষণ পরই একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি ফিরে এসে দেখেন তাঁর বন্ধুরা রক্তে মাখামাখি। একজন তাঁর সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, আরেকজনের ঘাড়ে গোলার টুকরা গেঁথে ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার দুই ঘণ্টা পর জানানো হয়, তাঁর তিন বন্ধু মারা গেছে।
যুদ্ধের আগে ইয়েমেন ছিল স্বপ্নের দেশ
যুদ্ধ শুরুর আগে ইয়েমেনে বেড়ে ওঠার দিনগুলো স্বপ্নের মতো ছিল বলে জানান সাহেল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক। তিনি বলেন, অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও চমৎকার আবহাওয়ার এই নিরাপদ ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশটি ছিল ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের সেরা জায়গা’। কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবকিছু পাল্টে যায়। সাহেল বলেন, ‘বোমার শব্দে আমি জেগে উঠতাম।’ গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে এই যুদ্ধে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। হুতিরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাঁর শহর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং অস্ত্রে সয়লাব হয়ে যায়। সাহেল বলেন, ‘আমার মনে আছে, কোনো কোনো দিন বাইরে গিয়ে দেখতাম, বোমার কারণে বালু একদম কালো হয়ে আছে।’
হুতিদের হাতে নির্যাতন ও দেশত্যাগ
পার্ট-টাইম ফটোগ্রাফার ও মডেল হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সাহেল হুতিদের নজরে পড়ে যান। একদিন পার্কে ফটোশুটের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সেনারা এসে তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও সামরিক ঘাঁটির ছবি তোলার অভিযোগ আনে। তারা ক্যামেরা কেড়ে নেয় এবং তাঁকে ব্যারাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর শুরু করে। সাহেল বলেন, ‘তারা বারবার বলছিল যে আমি যেহেতু ইংরেজি বলতে পারি, তাই আমি নিশ্চয়ই যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করি। আর আমি তাদের জন্যই ছবি তুলছি।’ তারা তাঁকে সেনাদলে যোগ দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। সাহেল বলেন, ‘আমি জানতাম, তারা ১৪ বছরের ছোট শিশুদেরও ধরে নিয়ে যেত। এরপর পরিবারের কাছে তাদের লাশ ফেরত দিয়ে বলত, “সে এখন বেহেশতে আছে।” আমি আসলে মরতে চাইনি।’
২০২৩ সালে ২১ বছর বয়সে সাহেল দেশ ছেড়ে মিসরে যান। সেখানে তাঁকে বারবার ইয়েমেনে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। বন্ধুদের পরামর্শে তিনি ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তুরস্ক থেকে গ্রিসে যেতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে জেনে তিনি নৌকায় করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মানব পাচারকারী গ্রিক কোস্টগার্ডের নজর এড়াতে সবাইকে সাঁতরে তীরে উঠতে বাধ্য করে। সাহেল সাঁতরে তীরে পৌঁছে গেলেও দেখতে পান একজন লোক ও একটি শিশু পানিতে ডুবে যাচ্ছে। তিনি আবার পানিতে নেমে পড়েন এবং শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সাহেল বলেন, ‘ছেলেটার বয়স ১৬ বা ১৭ হবে, কিন্তু সে বড় ও মোটা ছিল এবং সাঁতারও জানত না। সে বারবার আমার মাথা পানির নিচে চেপে ধরছিল…আমি ডুবে যাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি ঘুরে ওর পেছনের দিকে চলে যাই এবং ওকে ঠেলতে ঠেলতে সাঁতরাতে থাকি।’
গ্রিসে অপমান ও যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো
গ্রিসে পৌঁছানোর পর সাহেলকে অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়। বন্ধুরা তাঁকে বলেন, যুক্তরাজ্যই একমাত্র দেশ যেটি এখনও আশ্রয় দিচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে সাহেল ফ্রান্সের ক্যালে শহরে যান ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার জন্য। ডিসেম্বরের শুরুতে ঠান্ডা ও বৃষ্টির মধ্যে তিনি নৌকায় ওঠেন। পাচারকারীর সঙ্গে আরেক পাচারকারীর ভয়ংকর মারামারি হয় এবং তারা বন্দুক নিয়ে গুলি চালায়। সাহেল বলেন, ‘কে জানে কী কারণে তারা আমাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা শুধু দৌড়াতে লাগলাম আর লুকিয়ে পড়লাম। এত গোলাগুলির পরও সেখানে কোনো পুলিশ আসেনি।’ পরে তিনি আরও প্রায় ৬০ জনের সঙ্গে অন্য একটি নৌকায় উঠে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান।
যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর সাহেল স্বস্তি অনুভব করেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগে আমি বহুদিন মানুষের মুখে কোনো হাসি দেখিনি। আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে, এমনটা অনুভব করেছিলাম। এখানে তুমি মানবতা আর দয়া খুঁজে পাবে। আমাকে আর মেরে ফেলা হবে না। আমি নিরাপদ।’ এ বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে আইনি বৈধতা নিয়ে থাকা ও কাজ খোঁজার সুযোগ পাওয়ার পর সাহেল নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবেন। একই সঙ্গে ফেলে আসা ইয়েমেন নিয়ে বেদনা তাঁকে পোড়ায়। তাঁর ভাষায়, দেশটি ‘শয়তানের হাতে বন্দী এক টুকরা বেহেশত’। সাহেল বলেন, ‘আমি সত্যিই দেশটাকে খুব গভীরভাবে অনুভব করি। কিন্তু আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে, তা আমি ভীষণ ঘৃণা করি। আমি মাঝরাস্তায় গুলি খেয়ে অকারণে মরতে চাই না। আমি জগতে বড় কিছু করতে চাই এবং একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আমি এই জিনিসটারই খোঁজ করছি।’



