ইরানের কৌশলগত চালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের অবস্থানকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করলেও, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর নিজের হাতের তাসের শক্তি নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চেয়ে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বহুগুণ শক্তিশালী হলেও, ইরান তার সীমিত সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: ইরানের তুরুপের তাস
ইরান হয়তো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে পরাজিত করতে পারবে না, কিন্তু জ্বালানি রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা একটি শক্তিশালী কৌশলগত চাল দিয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার পাশাপাশি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতে চলে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য নিয়ে সংশয়
হোয়াইট হাউস ইরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০টি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি পাওয়াকে ট্রাম্পের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দাবি করছে। তবে, বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি দৃষ্টিকটু অবস্থান, কারণ যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে দিনে গড়ে ১০০টির বেশি ট্যাংকার চলাচল করত। ফলে, এই ছাড়টি নগণ্য এবং আসলে ট্রাম্পের নিজের তৈরি সংকটের একটি ক্ষুদ্র অংশ মেরামতের চেষ্টামাত্র।
সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও, এর ফলে ইরান যদি একটি মার্কিন জাহাজও ডুবিয়ে দেয়, তবে তা তেহরানের জন্য একটি বড় প্রোপাগান্ডা বিজয়ে পরিণত হবে। আবার, ইরানকে পিছু হটাতে হলে ট্রাম্পকে স্থলসেনা মোতায়েন করতে হতে পারে, যা মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়াবে এবং ট্রাম্পের নড়বড়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটে ফেলবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফলে ইতিমধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। যদি এই অবস্থা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এছাড়া, ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশল উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও হুমকির মুখে ফেলছে, যারা তেলনির্ভরতা কাটাতে চেষ্টা করছিল।
সময়ের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষমতা পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ তত বাড়বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ছে, যা একসময় ট্রাম্পকে বাধ্য করে এমন চুক্তিতে সই করতে পারে যেটা তাঁকে বিশ্বের সামনে শক্তিশালী নেতার বদলে অনুনয়কারী নেতার মতো তুলে ধরবে। তবে, ইরানের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার জন্যও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা জরুরি।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিণতি
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমারের মতে, পরিস্থিতি একটি বড় সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্প যদি ধৈর্য হারান, তবে তিনি খারগ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালির দ্বীপগুলো দখলের নির্দেশ দিতে পারেন, যা যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ রূপ দিতে পারে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পার্সি সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি হামলা বাড়িয়ে দিতে পারেন, ফলে উভয় পক্ষকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ দিতে হবে, নইলে পুরো বিশ্বের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।



