মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়ায় ম্লান ঈদের আনন্দ, কোটি মানুষের দুর্ভোগ
যুদ্ধের ছায়ায় ম্লান ঈদের আনন্দ, কোটি মানুষের দুর্ভোগ

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বোমার ধোঁয়া, ঈদের আনন্দে কালো ছায়া

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ ঘন মেঘে ঢাকা, কিন্তু তা বৃষ্টির নয়, বরং বোমা ও বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। এই ধোঁয়ার নিচে চাপা পড়ে গেছে কোটি কোটি মানুষের ঈদের উৎসব ও আনন্দ। লেবানন, ইরান এবং গাজা জুড়ে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যেখানে উৎসব পালন এখন একটি দুর্বহ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

লেবাননে তাঁবু শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের করুণ দশা

বৈরুতের ওয়াটারফ্রন্ট এলাকা একসময় দামি রেস্তোরাঁ এবং মদের বারের জন্য বিখ্যাত ছিল, কিন্তু আজ সেখানে সারি সারি তাঁবু দেখা যায়। ইসরায়েলি হামলায় বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে ঠাসা এই ‘তাঁবু শহরে’ ঈদ নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সিরীয় শরণার্থী আলা, যিনি অধিকৃত গোলান মালভূমি থেকে এসেছেন, এখন গৃহহীন। তিনি বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি দাহিয়েহ-তে থাকতেন, যা ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লেবাননজুড়ে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে, এবং আলা সারাদিন ঘুরেও কোনো স্কুলে আশ্রয় পাননি। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো এই মানুষটি ঈদের আনন্দের বদলে একটি তাঁবুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা

লেবাননের মতো ইরানেও পরিস্থিতি নাজুক। যুদ্ধের আগে থেকেই দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকট চলছিল, এবং এখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে ঈদের কেনাকাটা। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের মতো স্থানগুলো বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে কেনাকাটা করা ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা যোগ হয়েছে, যেখানে অনেক সরকারবিরোধী ইরানি ধর্মীয় প্রকাশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থন হিসেবে দেখছেন। এবার শুক্রবার পড়েছে পারস্য নববর্ষ নওরোজ, ফলে একটি বড় অংশ ঈদ বর্জন করে কেবল নওরোজ উদযাপনে মনোযোগী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাজায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট

গাজার অর্থনৈতিক অবস্থা এখন খাদের কিনারে। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে সবকিছুর দাম চড়া, এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর পণ্য আমদানিতে নতুন কড়াকড়ি দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। শিশুদের খেলনা কেনাও এখন বাবা-মায়ের জন্য দুঃস্বপ্ন। গাজা সিটির ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব রেমাল বাজারে এসেছিলেন দাম দেখতে, যিনি তার আংশিক বিধ্বস্ত বাড়িতে বাস করেন। তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে বাজারের ভিড় দেখে মনে হতে পারে ঈদের আমেজ আছে, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে মানুষ শেষ হয়ে গেছে।’ আগে তিনি ঈদে পরিবারকে ৩ হাজার শেকেল উপহার দিতেন, এখন ফল ও সবজি কেনারও সামর্থ্য রাখেন না।

আশার আলো খুঁজে চলা মানুষের সংগ্রাম

তিন সন্তানের জননী শিরীন শ্রীম গাজা সিটির একটি দেয়ালহীন অ্যাপার্টমেন্টে ত্রিপল টাঙিয়ে বাস করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঈদ আনন্দ অপূর্ণ। দুই বছরের যুদ্ধের পর মৌলিক চাহিদাও আজ মিলছে না। মানুষ রাস্তায় কাপড়ের তাঁবুতে থাকছে, তারা কীভাবে ঈদ করবে?’ তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু মানুষ আশার আলো খুঁজছেন। বৈরুতের রাজনৈতিক গবেষক ও সংগঠক করিম সাফিয়েদিন জানান, বাস্তুচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার বড় পরিবারের সঙ্গেই ঈদ পালন করবেন। তিনি বলেন, ‘পরিবারের বন্ধন দৃঢ় করা এবং সামাজিক সংহতি তৈরি করাই হলো এই যুদ্ধে টিকে থাকার প্রথম শর্ত। সংহতি ছাড়া আমরা সমাজ বা দেশ গড়তে পারব না।’

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কোটি মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখোমুখি, যেখানে ঈদের উৎসব একটি স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। বোমারু বিমানের নিচে দাঁড়িয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে, কিন্তু তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলবে।