গাজা পুনর্গঠনে গোপন বৈঠক: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্ভাব্য দায়িত্ব ও প্রশ্ন
ইসরায়েলি দখলদারিত্ব বজায় থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ভূখণ্ডের পুনর্গঠন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৈরি আন্তর্জাতিক মঞ্চ 'বোর্ড অব পিস'-এর একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে গাজা পুনর্গঠনের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের লজিস্টিক জায়ান্ট সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করেছে।
পুনর্গঠনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সহায়তা
গাজা পুনর্গঠনে 'বোর্ড অব পিস'-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা বর্তমান সহায়তার তুলনায় অনেক বেশি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস অন্তত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড গাজার একটি বড় অংশের পুনর্গঠন দায়িত্ব পেতে পারে। এই সংস্থাটি বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে প্রতিদিনের বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের অভিজ্ঞতাকে এই প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
বৈঠকের লক্ষ্য ও ফিলিস্তিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গোপন বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল গাজার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ত্রাণ ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে কীভাবে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, তা নির্ধারণ করা। তবে এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে চলমান সংঘর্ষে গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, এবং এই পরিস্থিতিতে পুনর্গঠন প্রচেষ্টা জটিল হয়ে পড়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি ট্রাম্পের উদ্যোগেই আনুষ্ঠানিকভাবে 'বোর্ড অব পিস'-এর সূচনা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, যদিও ভারতসহ অনেক দেশ এই বৈঠকে অংশ নেয়নি।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের জল্পনা
ট্রাম্প বৈঠকে দাবি করেছিলেন যে গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র নেবে এবং সেখানে 'রিভিয়েরা অব দ্য মিডল ইস্ট' গড়ে তোলা হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে যে, শান্তিপ্রক্রিয়ার আড়ালে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ বাড়ানো কি এই উদ্যোগের পেছনের উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক গোপন বৈঠক এই জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন গাজায় শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে। ইসরায়েলি বাহিনী এখনও উপত্যকার বিশাল এলাকা দখল করে রেখেছে, এবং গত অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও মানবিক ত্রাণের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে।
মানবিক সংকট ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় আরও সাত শতাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যা মানবিক সংকটকে তীব্রতর করছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা খসড়া প্রস্তাবের নথিতে একটি নিরাপদ ও শনাক্তযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা দেখা যায়, পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। তবে এই নথির প্রকৃত লেখক কে বা আলোচনা কতদূর এগিয়েছে, তা এখনও অস্পষ্ট। ডিপি ওয়ার্ল্ডের একজন মুখপাত্র এই আলোচনার ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের একটি যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে গাজা পুনর্গঠনে মোট সাত হাজার ১৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে আগামী ১৮ মাসেই অন্তত দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলার দরকার। এই প্রেক্ষাপটে, সাম্প্রতিক গোপন বৈঠক পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু ফিলিস্তিনি অংশগ্রহণ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত না করলে তা টেকসই সমাধান আনতে ব্যর্থ হতে পারে।
হামাস ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা
এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-মুঘায়্যির গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৩ বছর বয়সি এক শিশুসহ দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, এই নৃশংস হামলায় আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন যে, ইসরায়েলি সৈন্য ও বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের তাড়াতে যৌন হয়রানি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের জোরপূর্বক নগ্ন করা এবং যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।



