ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানের হামলায় মার্কিন ২০ সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত

পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন দেশে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইরানের হামলার পরিধি যতটা ব্যাপক বলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি।

পটভূমি ও হামলার বিবরণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিশানা করে ইরান। এতে এসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ ও রাডার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার বিবরণ

বিবিসি ভেরিফাই যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, কোনো কোনো বিশ্লেষক এ সংখ্যা ২৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মূল্যবান লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদার এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাটারি সিস্টেম রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরণের মাত্র আটটি ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যাটারি রয়েছে বলে জানা যায়, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে মোতায়েন করা আছে। এ ব্যবস্থা তৈরি করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ হয়। প্রতিটি ব্যাটারি পরিচালনায় প্রায় ১০০ সেনার একটি দল প্রয়োজন হয়। আর এটি থেকে উৎক্ষেপণ করা প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহকারী ও নজরদারি বিমানে ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বিমানবন্দর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিমান ও গর্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ভূ-স্থানিক ও গোয়েন্দা-তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মায়ারের একজন বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত একটি বিমানকে ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি প্রতিস্থাপন করতে ৭০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

অন্য জায়গার মধ্যে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজানেও হামলা চালিয়েছে ইরান। সংঘাতের সময়ে একাধিকবার আক্রান্ত হওয়া আলী আল সালেম ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রে জ্বালানি মজুত রাখার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংকার, বিমানের হ্যাঙ্গার ও সেনাদের থাকার জায়গা শনাক্ত করেছেন মায়ারের বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি জেনস ক্যাম্প আরিফজানে স্যাটেলাইট যোগাযোগ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস-অ্যাডমিরাল মার্ক মেলেট বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, এসব ব্যাটারি একটি ‘অত্যন্ত জটিল’ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা দ্রুত বা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকো বলেন, ‘শুরুর দিকে ইরানের হামলাগুলো মূলত সংখ্যার দিক থেকে বেশি ছিল। ব্যাপক সংখ্যার মাধ্যমে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার জন্য এভাবে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’ তবে কয়েকদিনের মধ্যে ইরান আরও ছোট ও নিখুঁত লক্ষ্যমুখী আক্রমণের দিকে চলে যায়।

মায়ার–এর একজন বিশ্লেষক বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, তেহরানের যুদ্ধকৌশল যখন পরিবর্তিত হচ্ছিল, তখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সীমার বাইরে থাকা নিজেদের বিমানগুলো সরিয়ে না নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধের শুরুর দিকে এক ধরণের আত্মতুষ্টির পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয়।’

মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয়

মে মাসে পেন্টাগনের একটি আনুমানিক হিসাবে অপারেশন এপিক ফিউরির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এ অর্থের এক বড় অংশ এ সংঘাতে ধ্বংস হওয়া ‘সরঞ্জাম মেরামত বা প্রতিস্থাপনের খরচে’ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির মতে, প্রকৃত খরচ সম্ভবত এর চেয়েও বেশি। পেন্টাগনের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪২টি বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ ফাইটার জেট, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ-১০ অ্যাটাক প্লেন রয়েছে।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ‘এ অঞ্চলের কোনো জাতি ও ভূখণ্ড মার্কিন ঘাঁটির জন্য আর ঢাল হিসেবে কাজ করবে না।...সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো নিরাপদ স্থান থাকবে না। দিন দিন তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে আরও দূরে ছিটকে পড়বে।’

গ্রিকো সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং আবার যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলো সে ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংঘাতের ফলে মার্কিন ও তার অংশীদারদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে শেষ হয়ে গেছে। এই মজুত দ্রুত পূরণ করার কোনো সহজ উপায় নেই। এর অর্থ হলো, ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে সংঘাতের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিমাণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, এবার সেটার মাত্র সামান্য অংশ দিয়ে তা মোকাবিলা করতে হবে।