একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানা কেবল মানচিত্রের কিছু রেখাচিত্র নয়, বরং তা তার নাগরিকদের জীবন, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার এক অলঙ্ঘনীয় সুরক্ষাবলয়। কিন্তু বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এক রক্তক্ষয়ী নিয়তির মুখোমুখি। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমার—এই দেশের প্রান্তসীমাকে কেন্দ্র করে এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও কাঁটাতারে ঘেরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, যেখানে প্রতিনিয়ত ঝরছে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের রক্ত, আর দক্ষিণে মিয়ানমার সীমান্ত— যা জাতিগত নিধনযজ্ঞ, যুদ্ধাপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের এক জীবন্ত আন্তর্জাতিক সাক্ষী।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত: রক্তস্নাত কাঁটাতার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার গুলি, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম অবমাননা। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’, ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক), ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তে নিহতের সংখ্যা কখনোই শূন্যে নামানো যায়নি। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত ২৫ বছরে বিএসএফের হাতে অন্তত ১৯০০ থেকে ২০০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে অন্তত ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৮২ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। ২০২৫ সালে পূর্বের রেকর্ড ভেঙে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলি বা হেফাজতে নির্যাতনে মারা যান। আসক-এর ভৌগোলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিগত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের সীমান্ত এলাকায় (বিশেষ করে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।
এই সীমান্ত সহিংসতার শিকার কেবল বাংলাদেশের নাগরিকরাই নন, ভারতের প্রান্তিক ও দরিদ্র নাগরিকরাও এর সমান অংশীদার। নয়া দিল্লি এই মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করতে না চাইলেও, ভারতের স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) ও এইচআরডব্লিউ-এর অনুসন্ধানে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলোতে ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে অন্তত ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিককে হত্যার সুনির্দিষ্ট ঘটনা ‘মাসুম’ ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে পেশ করেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে গেছে। প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকার হতদরিদ্র পরিবারগুলো বিএসএফের হয়রানি ও রাষ্ট্রীয় ভয়ের মুখে মামলা করার সাহস না পাওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক বিধান অনুযায়ী, অবৈধ অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানের সন্দেহভাজনদের দেওয়ানি আইনের অধীনে বিচারের মুখোমুখি করার কথা থাকলেও বিএসএফ নিজেই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করছে। ২০১০ সালে এইচআরডব্লিউ-এর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিএসএফ সন্দেহভাজনদের দেখামাত্রই বুক বা মাথায় লক্ষ্য করে সরাসরি প্রাণঘাতী বুলেট চালায়। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটে সরাসরি গুলিতে— যা চোরাচালানের সন্দেহে বা জিরো লাইনের কাছে কৃষিকাজ করার সময় ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’র অজুহাতে চালানো হয়। বাকি ৪০ শতাংশ মৃত্যু ঘটে বিএসএফ ক্যাম্পে রাইফেলের বাঁট বা বুট দিয়ে অমানুষিক নির্যাতনের ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে, যা পরবর্তীতে স্থানীয় থানায় ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে রেকর্ড হয়। বলপ্রয়োগের এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে জাতীয়তার পার্থক্য অনেক সময়ই ঢাকা পড়ে যায়।
উভয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিএসএফের বিচারিক কাঠামো চরম ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে। এর মূল হাতিয়ার ‘বিএসএফ আইন, ১৯৬৮’-এর অপব্যবহার, যার অধীনে বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার চালাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়— যা প্রায় কখনোই দেওয়া হয় না। এনএইচআরসি অনেক সময় ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিলেও দোষী জওয়ানদের কঠোর শাস্তির নজির বিরল। ওপারে যখন এই কাঠামোগত নিপীড়ন চলছে, এপারে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন কেবল সুযোগ-সুবিধা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় এই জাতীয় সংকটকে উপেক্ষা করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
প্রায় ৪১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত আজ বিশ্বের অন্যতম রক্তাক্ত সীমান্ত। ২০১১ সালে কিশোরী ফেলানীর কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে ওঠে, যার বিচারপ্রক্রিয়া বিএসএফের অভ্যন্তরীণ আদালতে প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি সীমান্তরক্ষীদের আরও আগ্রাসী করে তুলেছে এবং সীমান্ত অঞ্চলের নাগরিকদের মনে এক স্থায়ী ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে। এই ভয়ের সংস্কৃতি ও সামরিকীকরণ আরও জোরালো হচ্ছে, কারণ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত, বন্যাপ্রবণ ও দুর্গম নদী-জলাভূমি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে বাধা সৃষ্টির জন্য কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব বিবেচনা করছে বিএসএফ। রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এই নিয়মতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত আক্রমণ স্পষ্টতই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
কাঁটাতারের আড়ালে আইনি অধিকারের অবমাননা: পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাক
সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমান্তরালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র রূপ নিয়েছে ‘পুশ-ইন’ বা অনানুষ্ঠানিক জোরপূর্বক পুশ-ব্যাক। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই কিংবা কূটনৈতিক প্রটোকল না মেনে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোকে গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এবং ২০২৫-২০২৬ সাল জুড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সন্দেহভাজনদের ধরে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা ভয়াবহ। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে পুশ-ইনের মোট সংখ্যা প্রায় ৩৪৯৩ জনে পৌঁছায়। ফেরত আসা অনেকেরই দাবি— তারা ভারতের নাগরিক এবং এই পদক্ষেপটি মূলত বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে অমানবিকীকরণের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
পুশ-ইনের শিকার এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছেন মোট পুশ-ইনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জুড়ে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থী, যাদের ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, দিল্লি বা হায়দারাবাদের মতো বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আটক করার পর কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক প্রটোকল বা মানবিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছেন ভারতের প্রান্তিক মুসলিম নাগরিকরা, যারা মোট সংখ্যার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ভারতীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘মাসুম’-এর আইনি নথিপত্র অনুযায়ী, এই পুশ-ইনের শিকার অনেকের কাছেই আধার কার্ড, ভোটার আইডি কিংবা রেশন কার্ডের মতো ভারতের বৈধ নাগরিকত্ব ও নথিপত্র ছিল— যা বিএসএফ সদস্যরা অন্যায়ভাবে কেড়ে নিয়ে তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। অবশিষ্ট ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ নিয়ে গঠিত হয়েছে তৃতীয় শ্রেণিটি, যার অন্তর্ভুক্ত হলেন মূলত বাঙালি অভিবাসী ও পাচারের শিকার সাধারণ মানুষ; এরা হয় উন্নত জীবিকা ও কাজের সন্ধানে সীমান্ত পার হয়েছিলেন, অথবা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের নিষ্ঠুর শিকার হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি অবৈধ অভিবাসী কিনা তা নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার আইনি প্রক্রিয়ার চরম অবমাননা। পুশ-ইনের সময় তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বলপ্রয়োগ করা হয়। আসাম বা বাংলায় ‘যাবই লাগিবো’ (যেতেই হবে) বলে হুমকির পাশাপাশি মাঝরাতে কোমরে প্লাস্টিকের খালি বোতল বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।
এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি এবং ‘যৌথ বহিষ্কার নিষেধাজ্ঞা’র পরিপন্থী। পরিচয় নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মানুষকে ঠেলে দেওয়া এবং মানবপাচারের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তার পরিবর্তে অপরাধী সাব্যস্ত করে ‘পুশ-ইন’ করা তাদের নতুন করে সীমান্ত এলাকার অপরাধী চক্রের ঝুঁকিতে ফেলছে।
পুশ-ইন যে ভারতের নিজস্ব আইনি কাঠামোর সাথেও সাংঘর্ষিক, তা দেশটির ভারতের উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রুলিংয়ে স্পষ্ট। দিল্লি থেকে ধরে এনে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা ভারতীয় নাগরিকদের স্বজনরা আদালতে ‘হেবিয়্যাস কর্পাস’ (বন্দি প্রদর্শন রিট) আবেদন করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতা হাইকোর্ট তাদের ভারতে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২২ মে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, বাংলাদেশে পুশ-ইন করা ৫ জন ভারতীয় নাগরিককে তারা ফিরিয়ে নেবে এবং পুনরায় তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করবে। এর আগে সোনালী খাতুন নামের এক ভারতীয় নারীকে সন্তানসহ মানবিক কারণে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই আইনি ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করে যে, বিএসএফ অনেক ক্ষেত্রে ভারতের প্রকৃত নাগরিকদেরও বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
ভারত কর্তৃক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সামরিকীকরণ
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেবল প্রথাগত টহল থেকে সরিয়ে একটি সুসংহত এবং আক্রমণাত্মক সামরিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করেছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পটপরিবর্তনের পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই নতুন সামরিক কৌশলগুলো জোরদার করেছে। ভারত সরকার সীমান্তকে সম্পূর্ণ দুর্ভেদ্য করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সিকিউরিটি গ্রিড গড়ে তুলেছে। দুর্গম ও নদীমাতৃক সীমান্ত এলাকায় ‘কমপ্রিহেনসিভ ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ এবং ইলেকট্রনিক ফেন্সিং বসানো হয়েছে। থার্মাল ইমেজিং, হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা এবং ভূগর্ভস্থ সেন্সরের মাধ্যমে জিরো লাইনে যেকোনও ধরনের মানব-নড়াচড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিএসএফের কমান্ড সেন্টারে ধরা পড়ে। সীমান্ত পার হয়ে আসা ড্রোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ বা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত সীমান্ত জুড়ে আধুনিক জ্যামিং সিস্টেম ও লেজার-ভিত্তিক অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি মোতায়েন করেছে। একই সাথে বিএসএফ ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনে ড্রোন স্কোয়াড গঠন করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সীমান্ত সংলগ্ন অংশে সার্বক্ষণিক আকাশনজরদারি চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর ভারত সরকার বিএসএফের ইস্টার্ন কমান্ডের কাঠামো পুনর্গঠন করেছে। বিএসএফের শীর্ষস্থানীয় অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেলের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কৌশলগত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত ব্যাটালিয়ন সেনা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট রি-ডেপ্লয় বা পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছে। অনুপ্রবেশের রুটগুলো সিল করার জন্য সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় রাজ্য পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। সীমান্ত জেলাগুলোতে ১০ ফুট উঁচু বেষ্টনীসহ কড়া পাহারার বিশেষ ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ডিটেনশন নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, যা পুশ-ইন ও তাৎক্ষণিক সামরিক বহিষ্কারের প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের এই নতুন সামরিক ব্যবস্থাপনা স্পষ্ট করে যে, তারা বাংলাদেশ সীমান্তকে একটি উচ্চ-প্রযুক্তির কঠোর সামরিক বেষ্টনীতে পরিণত করছে, যা প্রথাগত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী।
মিয়ানমার সীমান্তে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত অঞ্চলের সমীকরণটি আরও জটিল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সরাসরি আওতাধীন। ২০১৭ সালে মিয়ানমার জান্তা বাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে পদ্ধতিগত গণহত্যা, গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে, তা সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ। এর ফলে প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। রোম সংবিধির অধীনে ‘জোরপূর্বক নির্বাসন’ বা ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’ একটি সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ (আরাকান আর্মি এবং জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ) বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। আরাকান আর্মির কর্তৃক রোহিঙ্গ্যাদের বিরুদ্ধে নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং নৃশংসতার কারণে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে এবং অনেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশও করেছে। রাখাইনে বর্তমানে চিকিৎসা, খাদ্য এবং নিরাপত্তার চরম সংকট চলছে। আরাকান আর্মি এখন উত্তর রাখাইনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করায় সেখানকার অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের জীবন সম্পূর্ণ তাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। অপরদিকে, মিয়ানমার থেকে ছিটকে আসা মর্টারর শেল ও ভারী গোলাবারুদে বাংলাদেশের নাগরিকরা হতাহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে সীমান্ত এলাকায় ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখা এবং আকাশসীমা লঙ্ঘন করার ঘটনাগুলো কেবল যুদ্ধাপরাধের শামিলই নয়, বরং তা বাংলাদেশের সীমান্তবাসীর জীবনধারণের অধিকারকে সম্পূর্ণ বিপন্ন করে তুলেছে।
রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, কোনও বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালানো মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রধান শর্ত। মিয়ানমার সেনাবাহিনী (জান্তা) এবং আরাকান আর্মির মধ্যকার লড়াইয়ে বাংলাদেশের ঘুমধুম, নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের বেসামরিক নাগরিকরা প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। সীমান্ত ও আকাশসীমা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারী গোলাবর্ষণ ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে— যার ফলে নিজ ঘরে বা ফসলের মাঠে কাজ করা নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিকরা নিহত ও পঙ্গু হচ্ছেন। নিজের ভূখণ্ডে থেকেও এভাবে ধারাবাহিক জীবননাশের ঝুঁকিতে থাকা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
মিয়ানমার বাহিনী আন্তর্জাতিক চুক্তি অমান্য করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার জিরো লাইনের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে হাজার হাজার নিষিদ্ধ ‘অ্যান্টি-পারসোনাল ল্যান্ডমাইন’ ও আইইডি পুঁতে রেখেছে। এই ল্যান্ডমাইনগুলোর শিকার হচ্ছেন সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশি কৃষক, কাঠুরিয়া এবং প্রান্তিক সাধারণ মানুষ। ল্যান্ডমাইনের বিস্ফোরণে বহু বাংলাদেশি নাগরিকের পা উড়ে গেছে বা তারা প্রাণ হারিয়েছেন। বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই ল্যান্ডমাইনের ফাঁদ টিকিয়ে রাখা এক ধরনের যুদ্ধাপরাধ ও অমানবিক নিষ্ঠুরতা। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় শত শত বাংলাদেশি জেলেকে মিয়ানমারের অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী (বিশেষ করে আরাকান আর্মি) ও বিজিপি কর্তৃক জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। অপহৃত এই নাগরিকদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কনসুলার সুবিধা বা আইনি অধিকার দেওয়া হয় না। বরং তাদের গভীর জঙ্গলে বা পাহাড়ি বন্দিশালায় আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে, যার বর্ণনা সম্প্রতি ফিরে আসা জেলেরা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় এটি জোরপূর্বক বন্দিকরণ এবং নির্যাতন—যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম উপাদান। মিয়ানমার থেকে ধেয়ে আসা অবিরাম গুলির শব্দ, মর্টার শেলের বিস্ফোরণ এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি ট্রলারে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর নির্বিচার গুলি ছোঁড়ার ঘটনা সীমান্তবাসীর মনে এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক বা সংস্কৃতিগত ভয় তৈরি করেছে। এই আতঙ্কের কারণে শত শত বাংলাদেশি পরিবারকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি, ফসলের জমি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হচ্ছে। নিজের রাষ্ট্রে থেকেও অন্য রাষ্ট্রের সশস্ত্র আগ্রাসনের কারণে এভাবে ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত’ হওয়া মৌলিক মানবাধিকারের মারাত্মক অবমাননা। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের কোনো স্বীকৃত বা বৈধ প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমানে কার্যকর নেই। জান্তা বাহিনীকে হটিয়ে সিংহভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার কারণে বাংলাদেশের নাগরিকদের ওপর যে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটছে, তার জন্য কাউকে আন্তর্জাতিক আইনের মুখোমুখি করা বা কূটনৈতিক উপায়ে জবাবদিহি করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই আন্তর্জাতিক জবাবদিহিহীনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে এই আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে বৈস্মিক ফোরামে জোরালো আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
মনে রাখা দরকার, একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্ত কেবল মানচিত্রের কিছু রেখাচিত্র নয়, বরং তা দেশের নাগরিকদের জীবন, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার অলঙ্ঘনীয় সুরক্ষাবলয়। তবে সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রতিবেশীদের আগ্রাসী নীতি এই সীমান্তকে এক রক্তক্ষয়ী সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভারত সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলমান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী ‘পুশ-ইন’ ও কঠোর সামরিকীকরণ এবং অপরদিকে মিয়ানমার সীমান্তে চলমান যুদ্ধাপরাধ, ল্যান্ডমাইনের নিষ্ঠুর ফাঁদ ও রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রান্তসীমা আজ এক সুপদ্ধতিগত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ হাতছানির মুখোমুখি।
রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৭ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, এই দ্বিমুখী সংকট কোনও প্রথাগত সীমান্ত অপরাধ নয়, বরং তা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়নের এক আন্তর্জাতিক দলিল। ফেলানীর কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশ থেকে শুরু করে নাফ নদীর মোহনায় বাংলাদেশি জেলেদের আর্তনাদ কিংবা ঘুমধুম সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা মর্টার শেল— সবই সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি সরাসরি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
এই দ্বিমুখী মানবিক ও কৌশলগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে প্রথাগত ও নমনীয় দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, যেন দেশটির উচ্চ আদালত এবং সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আইনি রুলিংয়ের সূত্র ধরে বেআইনি ‘পুশ-ইন’ এবং বিএসএফের একতরফা বলপ্রয়োগ চিরতরে বন্ধ করা যায়। একইসঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা ও আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আগ্রাসন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক ফোরামে জোরালো আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, কোনও রাষ্ট্র তার সীমান্তকে স্থায়ী কসাইখানা কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধের অভয়ারণ্য হতে দিতে পারে না। এই সীমান্ত সহিংসতা ও কাঠামোগত নিপীড়নকে যদি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের কঠোর নীতিমালার আলোকে এখনই বিশ্বমঞ্চে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে এদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক অপরিবর্তনীয় সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে একটি বহুমাত্রিক, নীতিগত ও সাহসী রাষ্ট্রীয় কৌশলের বাস্তবায়নই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।



