ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে শনিবার দিবাগত রাতে চালানো এক ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রবিবার জানিয়েছেন, এই হামলায় রাশিয়া তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেশনিক’ ব্যবহার করেছে। চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা এটি তৃতীয়বার। এই হামলায় ইউক্রেনের রাজধানীর সরকারি দফতরের কাছের বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কী এই হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেশনিক’?
‘ওরেশনিক’ শব্দের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘হেজেল গাছ’। এটি এমন একটি মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। সাধারণত দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) ক্ষেত্রে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত ‘আরএস-২৬ রুবেজ’ থেকে উদ্ভূত, যা রাশিয়া প্রাথমিকভাবে একটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করেছিল। রাশিয়ার অন্যান্য সামরিক প্ল্যাটফর্মের মতোই ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রটিও পারমাণবিক এবং সাধারণ উভয় ধরনের ওয়ারহেডে সজ্জিত করা যায়।
গতি ও পাল্লা কত?
এই ক্ষেপণাস্ত্রটি শব্দের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি গতিতে (ম্যাক ১০-এর বেশি বা ঘণ্টায় ১২ হাজার কিলোমিটারের বেশি) উড়তে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এটি উড্ডয়ন বা মাঝ-আকাশে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এটিকে ট্র্যাক করা বা মাঝপথে ধ্বংস করা চরম কঠিন। ওরেশনিকের কার্যক্ষমতার সীমা বা পাল্লা প্রায় ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ৩ থেকে ৬টি ওয়ারহেড বহন করতে পারে এবং এর প্রতিটি ওয়ারহেড আবার একাধিক ছোট উপ-অস্ত্রে সজ্জিত হতে পারে। এর ফলে এটি একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে একই সঙ্গে কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে।
ওরেশনিক কি ঠেকানো সম্ভব?
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন যে, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝপথে ঠেকানো বা প্রতিরোধ করা অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রটিতে যদি পারমাণবিক ওয়ারহেডের বদলে সাধারণ ওয়ারহেডও ব্যবহার করা হয়, তবুও এর ধ্বংসক্ষমতা একটি পারমাণবিক অস্ত্রের সমকক্ষ। তবে কয়েকজন পশ্চিমা বিশ্লেষক পুতিনের এই দাবি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং এগুলোকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ‘পরীক্ষামূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং এটি যুদ্ধক্ষেত্রের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো বড় কোনও বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, রাশিয়ার কাছে এ ধরনের অস্ত্রের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত বলেই ধারণা করা হয়।
প্রথম কবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই ওরেশনিক?
রুশ সামরিক বাহিনী ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম বারের মতো এই পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করেছিল। সে সময় আস্ট্রাখান অঞ্চলের কাপুস্টিন ইয়ার পরীক্ষামূলক কেন্দ্র থেকে ইউক্রেনের ডিনিপ্রো শহরের একটি সামরিক-শিল্প কারখানায় আঘাত হানার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। ওই হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রটি একাধিক ওয়ারহেড নিয়ে ম্যাক ১০-এর বেশি গতিতে ছুটে গিয়েছিল, যা যুদ্ধের একটি বড় ধরনের উসকানি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।



