গাছ বাঁচানোই আসল চ্যালেঞ্জ, শুধু লাগানো নয়
গাছ বাঁচানোই আসল চ্যালেঞ্জ, শুধু লাগানো নয়

প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসে হাজার হাজার চারা রোপণের খবর আসে, কিন্তু কয়েক বছর পর সেগুলোর কতটা বেঁচে থাকে—সে তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়। সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও, প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি ভুল প্রশ্ন করছি?

প্রকৃতির পুনর্জন্মের ক্ষমতা

মাহফুজ আহমেদ রাসেল, যিনি যুক্তরাজ্যের করপোরেট জীবন ছেড়ে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে স্থায়ী হয়েছেন, তিনি পিটাছড়া ফরেস্ট গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। তাঁর মতে, ‘গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচানো বেশি জরুরি।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রকৃতি নিজেই বন তৈরি করতে জানে—পাখি, বাতাস ও প্রাণীর মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন চারা জন্মায়।

সংখ্যার খেলা নয়, ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে প্রায়ই ১০ হাজার, ৫০ হাজার বা লাখো গাছ লাগানোর ঘোষণা আসে, কিন্তু পাঁচ বছর পর কতটি বেঁচে থাকে তা কেউ জানতে চায় না। এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল: আমরা কার্যক্রমের সংখ্যা গুনি, ফলাফলের নয়। অনেক ক্ষেত্রে গাছ লাগানো হলেও পরিচর্যা হয় না, আবার স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বিদেশি প্রজাতি যেমন আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাস রোপণ করা হয়, যা দ্রুত বাড়লেও স্থানীয় পাখি ও প্রাণীর জন্য কার্যকর আবাসস্থল বা খাদ্যের উৎস হতে পারে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শতবর্ষী গাছের মূল্য

একটি শতবর্ষী দেশীয় গাছের পরিবেশগত মূল্য শত শত নতুন চারার চেয়েও বেশি। একটি পুরোনো বট, অশ্বত্থ, কড়ই বা গর্জন গাছ কার্বন শোষণ করে, মাটি ধরে রাখে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তা সম্প্রসারণ বা অবহেলায় এমন গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। লেখক বলেন, ‘আমরা নতুন গাছ লাগানোর ছবি তুলতে ভালোবাসি—কিন্তু শতবর্ষী একটি গাছ কাটা ঠেকানোর জন্য সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারি না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ক্ষমতা

কোভিড-১৯ মহামারির সময় মানুষের হস্তক্ষেপ কমে গেলে নদী, বাতাস ও বন্যপ্রাণীর ওপর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও সিলেটের কিছু এলাকায় দেখা যায়, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ কম, সেখানে বন নিজে নিজেই ঘন হয়ে ওঠে। পাখি ও প্রাণীরা বীজ ছড়ায়, নতুন চারা জন্মায়—প্রকৃতি তার কাজ করতে জানে।

বৃক্ষরোপণের সঠিক পদ্ধতি

বৃক্ষরোপণ অপ্রয়োজনীয় নয়, বিশেষ করে শহরাঞ্চল, নদীর তীর ও ক্ষয়প্রাপ্ত এলাকায়। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি: প্রথমত, দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। তৃতীয়ত, গাছ বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করতে হবে—সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশীদারিত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। চতুর্থত, পাঁচ বা দশ বছর পর কতটি গাছ জীবিত আছে, তার হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

পরিবেশ রক্ষার নতুন স্লোগান

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বন ও গাছপালা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। লেখকের মতে, এখন সময় এসেছে স্লোগান বদলানোর: ‘গাছ লাগান’ নয়, ‘গাছ বাঁচান—পরিবেশ বাঁচান।’ কারণ প্রকৃতি নিজের মতো করে বন তৈরি করতে জানে। আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নতুন বন তৈরি করা নয়, বরং যে বন এখনও বেঁচে আছে, যে পুরোনো গাছগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে, আর যে জীববৈচিত্র্য এখনও টিকে আছে—সেগুলোকে রক্ষা করা।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত।