জলবায়ু সংকট: পৃথিবীর জ্বর থামছে না, সতর্ক বিজ্ঞানীরা
জলবায়ু সংকট: পৃথিবীর জ্বর থামছে না, সতর্ক বিজ্ঞানীরা

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু সংকট আছে, যা এক দিনে জন্মে না, আবার এক দিনে দৃশ্যমানও হয় না। সেগুলো ধীরে ধীরে আসে, সতর্কবার্তা দেয়, তথ্য দেয়, সংকেত দেয়; কিন্তু মানুষ যদি তা উপেক্ষা করে, তখন একসময় সংকটটি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা থাকে না—বর্তমানের বাস্তবতায় পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে আমরা আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই উপস্থিত।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

সম্প্রতি বিশ্বের ৭০ জনেরও বেশি শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানী এক যৌথ গবেষণায় বলেছেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, সমুদ্রের তাপপ্রবাহ রেকর্ড ভাঙছে, বরফ গলনের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতর হচ্ছে এবং সর্বোপরি—জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো ক্রমাগত অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীর উপমা

আইরিশ বিজ্ঞানী পিটার থর্ন একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, এই সূচকগুলিকে এমন এক রোগীর ‘ভাইটাল সাইন’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যার শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত অবনতিশীল। উপমাটি যথার্থ। কারণ পৃথিবী আজ যেন জ্বরে আক্রান্ত এক রোগী এবং বিজ্ঞানীরা সেই রোগীর থার্মোমিটার, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করছেন; কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগীর অবস্থা যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসকের হাতে থাকা যন্ত্রপাতিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্যাটেলাইট, সমুদ্রবয়া ও বৈজ্ঞানিক তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থার অর্থায়ন বিভিন্ন দেশে সংকুচিত হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিসংখ্যানের ভাষা

পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালেই পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করা যায়। ২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় প্রায় ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ১.৩৭ ডিগ্রিই মানব কর্মকাণ্ডের ফল। অর্থাৎ এই উষ্ণতা প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রের নয়—এটা মানুষেরই সৃষ্ট।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য

২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বনেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হবে; কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই সেই সীমা অতিক্রান্ত হবে।

অ্যান্টার্কটিকার ভয়ংকর সংবাদ

ইতিমধ্যে অ্যান্টার্কটিকা থেকে আসছে আরেক ভয়ংকর সংবাদ। ফ্রান্সের সমান আয়তনের সমুদ্রবরফ উধাও হয়ে গেছে। যে অঞ্চলে এই সময় বরফে আচ্ছাদিত থাকার কথা, সেখানে এখন প্রায় সম্পূর্ণ বরফহীন সমুদ্র। অ্যান্টার্কটিকার বেলিংসহাউসেন সাগরে এই ঘটনা গত চার বছরে তৃতীয় বার ঘটল। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটা আর ব্যতিক্রম নয়—এটা একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা।

প্রকৃতির শৃঙ্খল

প্রকৃতির জগতে কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরফ গললে কেবল বরফই হারায় না। পেঙ্গুইনের প্রজনন ব্যাহত হয়, হাজার হাজার ছানার মৃত্যু ঘটে, ক্রিল নামক ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, খাদ্যশৃঙ্খল দুর্বল হয়। পরবর্তীকালে সেই প্রভাব বৃহত্তর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের উপরও পতিত হয়। এর পাশাপাশি বরফের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ দুর্বল হলে বৃহৎ হিমবাহ অধিক দ্রুত গলতে শুরু করে, যা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ হয়।

মানবসমাজের বিচ্যুতি

কিন্তু এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক অন্যত্র। পৃথিবী যখন দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে, তখন মানবসমাজের মনোযোগ ক্রমশ অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানিসংকট, অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ জলবায়ু প্রশ্নকে পশ্চাতে ঠেলে দিচ্ছে। ঘরের ছাদে আগুন লেগেছে; কিন্তু মানবজাতি যেন ঘরের আসবাব নিয়ে তর্ক করতে ব্যস্ত!

সময় ফুরিয়ে আসছে

আজ অ্যান্টার্কটিকার গলিত বরফ, উত্তপ্ত সমুদ্র, বিলীয়মান প্রাণবৈচিত্র্য এবং দ্রুত নিঃশেষ হতে থাকা কার্বন বাজেট আমাদের সেই সত্য পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—খোদার উপর খোদকারি চলে না। এই কারণে প্রশ্ন এখন আর এই নয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে কি না। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এখনও যথাসময়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হব? আমরা বহুবার বলেছি, আমাদের আরেকটি প্ল্যানেট-বি নেই, সুতরাং কোনো প্ল্যান-বি-এর সুযোগ নেই। রোগীর জ্বর যখন থার্মোমিটারের সীমা ছাড়াতে চায়, তখন চিকিৎসার বিলম্ব মানে রোগীর জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান হ্রাস করা। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও আজ যেন সেই সময়ই উপস্থিত।