গত সোমবার কক্সবাজার থেকে ১টি হনুমান ও ১২টি কচ্ছপসহ হাদিস রহমানকে গ্রেপ্তার করে বন বিভাগ। এর আগে রাজধানীর মিরপুরের একটি গুদামে লুকিয়ে রাখা ছিল বিরল প্রজাতির ইগলপ্যাঁচা, হনুমান, রাজধনেশ ও পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপসহ ৪২টি বন্য প্রাণী। বন বিভাগের অভিযানে সেগুলো উদ্ধারের পর সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারের বড় এক নেটওয়ার্কের তথ্য।
আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্ক
বন বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে, উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলো কেবল একটি চালান। এর আড়ালে বহু বছর ধরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র শুধু বাংলাদেশি প্রাণীই নয়, বিভিন্ন দেশের বন্য প্রাণীও বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রের সদস্যরা পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা বিরল প্রাণী ঢাকায় এনে মজুত করতেন। পরে বিমানবন্দর ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে সেগুলো পাচার করা হতো দুবাই, কাতার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। চক্রটি এক দশকের বেশি সময় ধরে বন্য প্রাণী পাচার করে আসছে।
হাদিস রহমানের ভূমিকা
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা হাদিস রহমান একসময় রাজধানীর কাঁটাবনের একটি পোষা প্রাণীর দোকানে কর্মচারী ছিলেন। সেখানেই কাজ করতে করতে আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারকারী চক্রের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। চার বছর আগে মিরপুরে নিজে একটি পোষা প্রাণীর দোকান খোলেন। তার আড়ালে চলত পাচার।
গত মঙ্গলবার বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট মিরপুরের ওই গুদামে অভিযান চালায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ এখন আর শুধু উৎস দেশ নয়, আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট রুট’ হিসেবেও ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। ভারত থেকে বিভিন্ন প্রাণী বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছে চক্রটি। আবার বিভিন্ন দেশ থেকে বন্য প্রাণী বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে ভারতেও পাঠানো হচ্ছে।
স্থানীয় যোগসূত্র
মিরপুরের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বন্য প্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, গুদামটির মালিক হাদিস রহমান ও তাঁর স্ত্রী এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁরা বিরল প্রজাতির বন্য প্রাণী সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারপর বিমানবন্দর ব্যবহার করে এগুলো পাচার করেন।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা হাদিস রহমান একসময় রাজধানীর কাঁটাবনের একটি পোষা প্রাণীর দোকানে কর্মচারী ছিলেন। সেখানেই কাজ করতে করতে আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারকারী চক্রের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। চার বছর আগে মিরপুরে নিজে একটি পোষা প্রাণীর দোকান খোলেন। তার আড়ালে চলত পাচার।
কর্মকর্তাদের দাবি, এর আগে অন্তত চারবার ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যান হাদিস। এ কারণে চক্রটি বারবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
উদ্ধার হওয়া প্রাণী
উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর একটি ইগলপ্যাঁচা। সাধারণ লক্ষ্মীপ্যাঁচার চেয়ে এটি আকারে অনেক বড়। গত সোমবার কক্সবাজার থেকে ১টি হনুমান, ১২টি কচ্ছপসহ হাদিস রহমানকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে বন বিভাগ। আদালত তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
অনেক সময় বিদেশি পোষা প্রাণী যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন হয়ে বাংলাদেশে আসে। পরে সেগুলো ভারতে পাচার করা হয়। আবার ভারত থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন পাখির নখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে চীনে পাঠানো হয়। বিদেশ থেকে সরাসরি ভারতে পাঠালে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় পাচারকারীরা এই দীর্ঘ রুট ব্যবহার করে। —অসীম মল্লিক, বন্য প্রাণী পরিদর্শক
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা হাদিস রহমানকে নজরদারিতে রেখেছিলেন। বছরের বড় একটি সময় তিনি পাহাড়ের গহিন অরণ্যে কাটাতেন। পাহাড়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে অর্থের বিনিময়ে বিরল প্রাণী সংগ্রহ করতেন তিনি। তারপর এসব প্রাণী বিদেশে পাচার করতেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অনেককেই শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী
মিরপুরের গুদাম থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর অধিকাংশই সংরক্ষিত ও বিপন্ন প্রজাতির বলে জানিয়েছেন বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা। উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে আছে ইগলপ্যাঁচা, চশমাপরা হনুমান, রাজধনেশ, লজ্জাবতী বানর, শজারু, তিনটি গন্ধগোকুল ও পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে আরও আছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আলীকদম, লামা ও খাগড়াছড়ির গভীর অরণ্যের চশমাপরা হনুমান। আছে রাজধনেশও। বিশাল আকৃতির এই পাখি সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলের উঁচু গাছের কোটরে বাসা বাঁধে। এ ছাড়া আছে লজ্জাবতী বানর, শজারু ও তিনটি গন্ধগোকুল। এর মধ্যে একটি গন্ধগোকুলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। গন্ধগোকুলের সাতটি প্রজাতি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকির মধ্যে আছে।
উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপও আছে। এই প্রাণী পাহাড়ি পরিবেশের স্বাস্থ্যনির্দেশক। ১০০ থেকে ১৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা এই কচ্ছপ যেখানে পাওয়া যায়, সেখানে পরিবেশগত ভারসাম্য এখনো অনেকটা অক্ষুণ্ন রয়েছে বলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রাণী শুধু বনের বাসিন্দা নয়, পুরো বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ এখন ট্রানজিট রুট
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণী ও প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাংলাদেশে এনে পরবর্তীকালে অন্য দেশে পাঠানো হচ্ছে। পাচারকারীরা নজরদারি এড়াতে জটিল ও দীর্ঘ রুট ব্যবহার করছে।
বন্য প্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় বিদেশি পোষা প্রাণী যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন হয়ে বাংলাদেশে আসে। পরে সেগুলো ভারতে পাচার করা হয়। আবার ভারত থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন পাখির নখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে চীনে পাঠানো হয়।
অসীম মল্লিকের ভাষ্য, বিদেশ থেকে সরাসরি ভারতে পাঠালে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় পাচারকারীরা এই দীর্ঘ রুট ব্যবহার করে।
কচ্ছপের মাংস ও খোলসের বাজার
তদন্তে জানা গেছে, ভারত ও চীন থেকে আনা স্টার টরটয়েজসহ বিভিন্ন বিরল কচ্ছপ বাংলাদেশ হয়ে দুবাই, কাতার, ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব কচ্ছপের মাংস ও খোলসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মাংস দিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের স্যুপ। আর খোলস ব্যবহার করা হয় মূল্যবান অলংকার ও শৌখিন সামগ্রী তৈরিতে। ভারত ও চীন থেকে এসব কচ্ছপ সড়কপথে বাংলাদেশে আনা হয়। এরপর আকাশপথ বা স্থলপথে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়।
গত বছরের অক্টোবরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করা ৯২৫টি কচ্ছপ উদ্ধার করে বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। এর মধ্যে ছিল ১৪৫টি স্টার টরটোয়েজ (কচ্ছপ) ও ৭৮০টি কড়িকাইট্টা কচ্ছপ।
মোহাম্মদ শওকত আলী ভূঁইয়া নামের এক যাত্রীর লাগেজ স্ক্যানের সময় এসব কচ্ছপ ধরা পড়ে। তবে শওকত পালিয়ে যান।
নজরদারির দুর্বলতা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিমানবন্দর ও সীমান্তপথের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো দেশকে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। স্বর্ণ ও মাদক শনাক্তে বিমানবন্দর ও সীমান্তে তুলনামূলক কঠোর নজরদারি থাকলেও বন্য প্রাণী শনাক্তে এখনো রয়েছে প্রযুক্তিগত ও জনবলসংকট। এতে জীবন্ত প্রাণী কিংবা প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই নজরদারি এড়িয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে যাচ্ছে।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিরল প্রজাতির বন্য প্রাণী পাচার দেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বনের প্রতিটি প্রাণী বাস্তুসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে। দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল হতে পারে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং নীরব এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়।



