জলবায়ু পরিবর্তনই ইউরোপের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মূল কারণ: বিজ্ঞানীরা
জলবায়ু পরিবর্তনই ইউরোপের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কারণ

পশ্চিম ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে জুনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

তাপীয় চাপে ইউরোপের শহর

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের ৮৫০টি বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপীয় চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বাতাসে আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বা ঠান্ডা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এই তাপপ্রবাহ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের সমারসেটে জুনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপের একটি বড় অংশে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব

২০২২ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে প্রচণ্ড গরমে ৬০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। চলমান তাপপ্রবাহের সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব নিরূপণ করতে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের জন্য কিছুটা সময় লাগবে। তবে এটি যে ইতিমধ্যে জনজীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, তা নিশ্চিত। ইউরোপজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, হাসপাতালগুলো রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং ট্রেন ও বিমানের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) জোটের বিজ্ঞানীরা নতুন বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন দূষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে তাপমাত্রা কত দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ২০০৩ সালের গ্রীষ্মেও পৃথিবী আজকের মতো এতটা উত্তপ্ত ছিল না। তখনকার সবচেয়ে প্রচণ্ড গরম ও তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। এমনকি ১৯৭৬ সালের রেকর্ড খরা ও গরমের সময়েও তাপমাত্রা বর্তমানের চেয়ে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০০৩ সালে মানুষের রাতের ঘুমে যে পরিমাণ ব্যাঘাত ঘটত, বর্তমানে তার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবেশ বাঁচাতে এখনই জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সামনের দিনগুলোয় গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। তখন আজকের এই ভয়াবহ গরমের দিনগুলোকেই আমাদের কাছে অনেক আরামের বা শীতল মনে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক ও ডব্লিউডব্লিউএ দলের সদস্য থিওডোর কিপিং বলেন, ‘ইউরোপের এত বড় অঞ্চলে এর আগে কখনো এত তীব্র ও বিস্তৃত তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি। গত ৫০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর ফলে এ ধরনের তাপপ্রবাহের সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে গেছে।’

থিওডোর কিপিং আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন না হলে জুনে এমন তাপপ্রবাহ ঘটত না। আর যেভাবে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে আজকের গ্রীষ্মকেও তুলনামূলক শীতল মনে হতে পারে।’

তাপমাত্রার বিস্তার

বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, বৃহস্পতিবার ইউরোপে অন্তত ১০ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখে পড়েছেন।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, ‘কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর প্রতি বিশ্বের নির্ভরতার কারণেই জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তবে এর সমাধানও রয়েছে—দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বন রক্ষা করা এবং জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা।’

তাপ গম্বুজের প্রভাব

বিজ্ঞানীরা জানান, বর্তমানে ইউরোপের ওপর একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় বা ‘তাপ গম্বুজ’ তৈরি হয়েছে। এটি গরম বাতাস আটকে রেখেছে এবং সাহারা মরুভূমি থেকে আরও উষ্ণ বাতাস টেনে আনছে। তবে এটা নতুন কিছু নয়। নতুন বিষয় হলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই গরম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে।

মানবসৃষ্ট কারণ

গবেষকেরা আরও বলেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হওয়া এল নিনো পরিস্থিতির কারণে এই তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়নি। তাঁদের বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, এর মূল কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।

রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের গবেষক ক্যারোলিনা পেরেইরা মারগিদান বলেন, ‘২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পর ইউরোপের অনেক দেশ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও কর্মপরিকল্পনা চালু করেছে। এতে অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’