পলি জমে মরা খালে পরিণত হচ্ছে কপোতাক্ষ নদ, ৮১৭ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ
পলি জমে মরা খালে পরিণত হচ্ছে কপোতাক্ষ নদ

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর আকুতি—‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে’ এখন দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে এক গভীর বেদনার প্রতিধ্বনি। ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনার কয়রা উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদ একসময় প্রমত্ত, জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ছিল, কিন্তু সেই নদ আজ নিঃশ্বাসহীন। পলি জমে, দখলদারি ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় একদা খরস্রোতা নদটি অনেকটাই মরা খালে পরিণত হয়েছে।

কপোতাক্ষের বর্তমান অবস্থা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬৭ কিলোমিটার। চার জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষের বড় অংশ কয়রা উপজেলা হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের মালঞ্চ মোহনায় পড়েছে। বাস্তবে সেই অংশে এখন নদের চেয়ে ডুবোচর বেশি। কোথাও কোথাও নদের প্রস্থ কমে ৭৫০ মিটার থেকে মাত্র ১৫০ মিটারে ঠেকেছে।

৮১৭ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ

কপোতাক্ষ নদ পুনরুদ্ধারে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সূত্র জানায়, প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালে শুরু হওয়া ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ শেষ হয় ২০১৭ সালে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। পরে ২০২০ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প শুরু হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। দুই দফায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৭ কোটি টাকা। বর্তমানে যশোরের তাহেরপুর থেকে মনিরামপুর এবং খুলনার পাইকগাছা থেকে কয়রার আমাদী পর্যন্ত নদী খনন, তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। স্থানীয়দের অভিযোগ, খননের সুফল টেকসই হচ্ছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, নদে খনন শুরু হওয়ার পর তাঁরা অনেক আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন না যেতেই আবার পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বারবার প্রকল্প হচ্ছে, টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খননের পরও নদীর দুরবস্থা

কয়রার আমাদী ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, নদের তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে বড় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভাটার সময় পানির গভীরতা এক থেকে দেড় ফুটে নেমে আসে। পাইকগাছা থেকে আমাদীর মসজিদকুড় পর্যন্ত খননের চিহ্ন থাকলেও স্বাভাবিক রূপ নেই; বরং সরু খালের মতো দেখায়। দুই পাড়ে জেগে ওঠা জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বসতঘর, ইটভাটা ও চিংড়িঘের।

ভাটার সময় কাঠমারচর এলাকায় গিয়ে নদে বিস্তীর্ণ বালুচর দেখা যায়, যেখানে কিশোররা ফুটবল খেলছে। একসময় যেখানে মাছের সমারোহ ছিল, আজ সেখানে বালু উড়ছে। কয়রার খুটিঘাটা, গোবরা, মদিনাবাদ, লোকা ও দশহালিয়া এলাকায় নদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা যায়। চর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব

কপোতাক্ষের এ পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জেলে ও কৃষকদের জীবনে। কয়রার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ গাজী বলেন, আগে ভরা জোয়ারেও পানি বাঁধ ছুঁতো না। এখন নদের নিচে পলি জমে বাঁধ উপচে পানি পড়ে। প্রতি বছর লোনা পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হচ্ছে। ভূমিহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

সংকটের শেকড়

সংকটের শেকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় কয়েক দশক পেছনে। মাথাভাঙ্গা নদীর শাখা হিসেবে গড়ে ওঠা এ নদ একসময় এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস ছিল। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল জনপদ, কৃষি ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। কপিলমুনি, চাঁদখালী, শ্যামনগর, কেশবপুর, তালা, কয়রা—এসব এলাকার প্রাচীন বসতির ইতিহাস নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার সাক্ষ্য দেয়।

লেখক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, একসময় স্থানীয় জ্ঞাননির্ভর ব্যবস্থাপনায় কৃষকেরা নিজেরাই নদের পানি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ছয় বা আট মাস মেয়াদি অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে লোনা পানি ঠেকিয়ে কৃষিকাজ চালানো হতো, আবার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বজায় থাকত। কিন্তু ষাটের দশকে তৎকালীন ইপি-ওয়াপদার ‘কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্টের’ মাধ্যমে পোল্ডার বা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। জোয়ারের পানি বিলে ঢুকতে না পারায় নদীর মধ্যেই পলি জমতে থাকে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে ক্রমে উঁচু হয়ে নাব্যতা হারায়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

কপোতাক্ষের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা যশোর পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, পাইকগাছা থেকে কয়রা পর্যন্ত সাতটি প্যাকেজে নিয়ম মেনে খনন সম্পন্ন হলেও প্রায় ৭৫ লাখ ঘনমিটার পলি এসে নদীর ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশ আবার ভরাট হয়ে গেছে। শুধু খনন করে এ অঞ্চলের নদী সচল রাখা সম্ভব নয়। যেখানে ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (টিআরএম) কার্যকর হয়েছে, সেখানে নদী সচল আছে। কিন্তু টিআরএম না থাকলে দ্রুত পলি জমে নদী মরে যায়। দক্ষিণাঞ্চলের নদী সচল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি।

নদী দখলের বিষয়ে ফিরোজ হোসেন বলেন, খননের সময় মাটি নিয়ম মেনে ৩০ ফুট দূরে রাখা হলেও নদীর অনেক জায়গা আগে ইজারা দেওয়া ছিল। প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু ইজারা বাতিল করা সম্ভব হয়েছে। তবে খননের পর আবার দখলের চেষ্টা চলছে। নদী রক্ষায় এসব ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিল জরুরি।

পাউবোর খুলনার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাই কপোতাক্ষের নাব্যতা সংকটের মূল কারণ। মূলত পদ্মা-গড়াই হয়ে উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি; না হলে পলি সমুদ্রে যেতে না পেরে নদী ভরাট হতে থাকবে। টেকসই সমাধানে টিআরএমও কার্যকর হতে পারে। তবে এটি ব্যয়বহুল এবং বড় আকারে জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন।

পাইকগাছার কপোতাক্ষ পাড়ের বাসিন্দা নূর ইসলাম গাজী বলেন, খননের এক বছরের মধ্যেই নদী আবার ভরাট হয়ে গেছে। শুধু খনন করলেই হবে না, পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সবই বৃথা।