জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টেকনাফের দ্বীপগুলো অস্তিত্ব সংকটে
জলবায়ু পরিবর্তনে টেকনাফের দ্বীপ অস্তিত্ব সংকটে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের সীমান্তঘেঁষা জনপদ টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সাগর ও নদীভাঙনের অব্যাহত আঘাতে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস। গত এক দশকে এই দুই দ্বীপে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

ভাঙনের ভয়াবহতা

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দ্বীপ দুটির চারপাশে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনে গত দশ বছরে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত ভূমি সাগরে বিলীন হয়েছে। এতে দ্বীপের আয়তন যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে কৃষি ও বসবাসের উপযোগী জমির পরিমাণ। শুধু ভাঙনই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে সুপেয় পানির ওপর।

পানির সংকট

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরেজমিন চিত্র

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও সাগরের গর্ভে বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি, কোথাও হারিয়ে গেছে চাষের জমি। অনেক পরিবার বারবার ঘর সরিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। যারা আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছল, তারা দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়েছেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর অনেকেই এখনও সাগর ও নদীর পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দ্বীপের নদী-সাগরে পাড়েই টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়ার অবস্থা

টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত সড়কের পূর্ব পাশে নাফ নদের তীরে শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া। এখনও সেখানে শতাধিক পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। চরম ঝুঁকি হলেও বেঁচে থাকার যুদ্ধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

নদীর পাড়ে ঝুপড়ি ঘরে কথা হয় ৫৩ বছর বয়সী আলমাজ খাতুনের সঙ্গে। জোয়ারের পানি বাড়লে কী করেন জানতে চাইলে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘ধইজ্যা জোয়ারের পানি অইলে ঘরত থাহিত ন পারি। পানি বাড়লে অন্য ঘরে যাই, আবার কমলে ফিরি। যাইবার জায়গা নাই, এককান থাহিবার জায়গা চাই।’ তিনি জানান, এই নদীর পাড়ে বসবাসকারী অনেক মানুষ আশ্রয়স্থল ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু তিনবার ঘর হারিয়ে যাওয়ার পরও নদীর পাড়ে থাকছেন। কেননা এখান অন্যত্র গিয়ে ঘর করে সামর্থ্য নেই। তাই জীবনের এই টানাপোড়েন যেন জোয়ার-ভাটার মতোই প্রতিদিনের সঙ্গী তার।

হাতে জাল বুনতে বুনতে আলমাজ খাতুন বলেন, ‘নদীর পাড়ে অধিকাংশ মানুষের মাছ ধরা একমাত্র পেশা। এখান থেকে কি-বা আয় করে মানুষ চলে। অনেক কষ্টের জীবন। এই যে এত গরম পরছে, একটু ঠান্ডা বাতাস খাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি অথবা ঘূর্ণিঝড় এলে বাধ্য হয়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়। এরপর এখানে ফিরে আসি। দশ বছর ধরে জাল তৈরি করে সংসার চালাচ্ছি। আর কোনও পথ নেই।’

একই গ্রামের বাসিন্দা শাহেনা আক্তার (৫০)। একসময়ের সচ্ছল পরিবারের এই নারী ভাঙনের কবলে পড়ে এখন নিঃস্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটা সময় ঘরবাড়ি, জমিজমা, গরু ছাগলসহ সবই ছিল। সহায়সম্বল সব গিইল্লা খাইল এই নদী। আমাদের জীবন সংগ্রাম নাফের তীরে। সামন্য জোয়ারে পানি বাড়লে ঘরে থাকা খুব কষ্টকর। এমনকি ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলে বুকে কাঁপন শুরু হয়। আর যদি ঘূর্ণিঝড়ের খবর আসে তাহলে রাতে ঘুম হারাম হয়ে যায়।’

নাফ নদের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেন, ‘ওই ওখানে নৌকা ভাসে, সেখানেই একসময় ছিল প্রায় ৩০০ পরিবারের একটি পাড়া। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে চারবার বসতি হারিয়েছি আমরা। আমার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে এই জায়গাটিও আর বেশিদিন টিকবে না।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য

শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘জলবায়ুর প্রভাবে সাগর-নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গত দশ বছরে শাহপরীর দ্বীপের নদী-সাগর তীরে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ বসতি হারিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশেও আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছেন। কিন্তু অসচ্ছল পরিবারগুলো এখনও নদীর পাড়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার এলাকার প্রায় ৫০০ মানুষ নাফ নদের পাড়ে জীবনযাপন করছেন। প্রায় সময় ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি জোয়ারের পানি বৃদ্ধির কারণে এখন এসে মানুষের টিকে থাকা খুব কঠিন। নদীর পাড়ের লোকজন আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। সরকারের উচিত বাস্তুচ্যুতদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসন করা।’

সেন্টমার্টিনের অবস্থা

সেন্টমার্টিন বিচের কোনাপাড়ার বাসিন্দা হাফেজ উল্লাহ (৪৫)। সাগরে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন টেকনাফ পৌরসভার পল্লান পাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন সাগর পাড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু আর থাকা সম্ভব হয়নি। জীবনের সহায়সম্বল হারিয়ে গেছে সাগরে। এখন ধারদেনা করে পরিবার নিয়ে প্রবাল দ্বীপ ছেড়ে টেকনাফে এসে আশ্রয় নিয়েছি। কিছু করার নেই। সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা অসম্ভব। কেননা গত দশ বছরে জলবায়ু এটতা পরিবর্তন হয়েছে সাগর উত্তাল হলে জোয়ারের পানি ১০-১৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে পুরো দ্বীপ তলিয়ে যায়। তাই আমার মতো অনেকে দ্বীপে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ১০-১৫ বছরের মধ্যে সেন্টমার্টিন সাগরে তলিয়ে যাবে।’

সেন্টমার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ুর প্রভাবে দ্বীপের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে দ্বীপ আকারে ছোট হয়ে আসছে। তার ওপর সাগরে জোয়ারে গত ১০ বছরে অন্তত ২০০ পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। আবার অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকে চাষবাদ জমি হারিয়েছেন। দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকটও। যদি প্রবাল দ্বীপের চার পাশে বাঁধ-ব্লক না দেয় তাহলে ১০-১৫ বছরের মধ্য সেন্টমার্টিন সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।’

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা

জলবায়ুর প্রভাবে সব থেকে ক্ষতিক্ষস্ত হয়েছে সেন্টমার্টিনের ডেইল পাড়া, পশ্চিম পাড়া, কোনাপাড়া, পশ্চিম পাড়া, উত্তর বিচ। এ ছাড়া শাহপরীর দ্বীপের জালিয়া পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পশ্চিম পাড়ার অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। দ্বীপের বাসিন্দা নুর মুহাম্মদ বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই আজ আমাদের বেহাল অবস্থা। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে এখানে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। অভাবের কারণে ঘরের সামনে ভাঙন চলে এলেও অন্যত্র সরানোর কোনও সুযোগ নেই। আমার আশঙ্কা, আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই এই এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।’

পানির গুণগত মান

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর বলছে, গত পাঁচ বছরে জলবায়ুর প্রভাবে খাবারের পানি অভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কাজনক হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি পানিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে পানিতে ৯ গুণ বেশি লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় পানি থেকে দূরর্গন্ধও ছড়ায়।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদ টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন এমন পানি ব্যবহারে আর্সেনিকজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে।’

বিশেষজ্ঞদের মতামত

টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সাগর ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, টেকসই আবাসন এবং জীবিকা পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া। পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন ম্যাজিক ইনিশিয়েটিভ কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা জিমরান মো. সায়েক বলেন, ‘টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সাগর ও নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট কেবল পরিবেশগত নয়, এটি জলবায়ু ন্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের উচিত নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, টেকসই আবাসন ব্যবস্থা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতারও অংশ।’

সরকারের পদক্ষেপ

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘ঝুঁকিতে থাকা গৃহহীন মানুষকে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’