ভারতের তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় নিয়েছে। রাজ্যটির বিধানসভা নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখনো সরকার গঠন করতে পারছে না অভিনেতা ‘থালাপতি’ বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কালাগাম (টিভিকে)।
জোট গঠনে বিজয়ের চেষ্টা
বিজয় যখন জোট গঠনে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় তামিলনাড়ুর দুই দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মধ্যে নেপথ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, রাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরী এই দুই দলের সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা একেবারেই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও সূত্রের বরাত দিয়ে বলছে, বিজয়ের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক সংখ্যা ছুঁতে না পারলে হাত মেলাতে পারে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ডিএমকে ও এআইএডিএমকে। দুই দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এআইএডিএমকেকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিতে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে ডিএমকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ছোট দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টাও চলছে বলে জানা গেছে।
একটি সূত্রের ভাষ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিভিন্ন শিবিরের অভ্যন্তরীণ বৈঠক ও নেতাদের আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিষয়টি আর শুধু গুঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এআইএডিএমকে সূত্রও আলোচনা চলার কথা স্বীকার করেছে। তবে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে কংগ্রেস-সমর্থিত বিজয়ের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনার বিরোধিতায় তামিলনাড়ুর পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এই নজিরবিহীন সমীকরণে ডিএমকে সত্যিই সম্মত হবে কি না।
নির্বাচনে ডিএমকে ৫৯টি ও এআইএডিএমকে ৪৭টি আসন পেয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সমস্যাও রয়েছে। ডিএমকে ও এআইএডিএমকে জোট বাঁধলেও দুই দলের মোট বিধায়কের (এমএলএ) সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৬ জন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থন। ফলে এ দুই দলের জোট হলেও সরকার গড়তে ছোট দলগুলোর সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে তাদের।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রসঙ্গত, দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের জেরে ১৯৭২ সালে তৎকালীন ডিএমকে সভাপতি এম করুণানিধি দল থেকে বহিষ্কার করেন এম জি রামচন্দ্রন বা এমজিআর-কে। পরে এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠা করেন এমজিআর। সেই বিভাজনই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দুই দ্রাবিড় দলের কয়েক দশকের তীব্র দ্বৈরথের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়।
দুই শিবিরের জোট বাঁধার জল্পনা আরও উসকে দিয়েছেন ডিএমকে নেতা এসএএস হাফিজুল্লাহ। সমাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন: ‘আপনারা যে খবর শুনতে চলেছেন, সেটি তামিলনাড়ু ও গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে।’
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে বিজয় ব্যর্থ হলে
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে বিজয় ব্যর্থ হলে এই নতুন রাজনৈতিক টানাপড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। টিভিকেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ স্থানীয়, রাজ্যসভা ও পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত জোটের ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। প্রথমদিকে মনে করা হয়েছিল কংগ্রেসের এই সমর্থন হয়তো বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রশস্ত করবে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা যায়, এই জোটের কারণে অন্যান্য সম্ভাব্য শরিকদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন তিনি।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএর একাধিক শরিক দলের সূত্রও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছে, কংগ্রেস ও টিভিকের এই বোঝাপড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে দিয়েছে। এনডিএর অন্দরমহলের দুই নেতার ইঙ্গিত, কংগ্রেস-সমর্থিত টিভিকের সরকার গঠনে শরিক দলগুলো যাতে কোনোভাবেই সাহায্য না করে, সেই বার্তা আগেই দিয়ে রেখেছে 'দিল্লি'।
অন্যদিকে কংগ্রেসের এই পদক্ষেপে একান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডিএমকের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের এক প্রবীণ নেতার দাবি, বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনকে ফোনে রাহুল গান্ধী আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার পাশেই আছি।’ অথচ পরের দিনই টিভিকেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানায় কংগ্রেস।
চেন্নাইয়ের রাজনৈতিক মহলের প্রতিটি আলোচনাতেই এখন একটি কথাই ঘুরেফিরে আসছে- ‘যদি বিজয় ব্যর্থ হন’। আর এই সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়েই বুধবার রাতে শুরু হয়েছে এই নতুন রাজনৈতিক তৎপরতা।
এআইএডিএমকের কৌশল
এদিকে এআইএডিএমকে সূত্র জানিয়েছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও বিকল্প কৌশল নির্ধারণের জন্য দলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ককে পুদুচেরির একটি রিসর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের জল্পনা, বিজয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে সরকার গঠনের দাবি জানাতে পারে এআইএডিএমকে। তখন বাইরে থেকে সমর্থন জানাবে ডিএমকে। পাশাপাশি এই জোটে জায়গা পাবে ছোট দলগুলোও।
সম্ভাব্য ওই সমীকরণে এনডিএ জোটের শরিক পিএমকে ও এএমএমকে যেমন থাকতে পারে, তেমনই সিপিএম (২ বিধায়ক), সিপিআই (২ বিধায়ক), ভিসিকে, ডিএমডিকে (১ বিধায়ক) ও আইইউএমএল-এর (২ বিধায়ক) মতো দলগুলোরও এই ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই দ্রাবিড় শিবিরের একাংশের তরফে প্রকাশ্যে অবশ্য এ বিষয়ে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তাদের যুক্তি, তারা জনরায় বা বিজয়ের বিরোধিতা করছেন না। তারা শুধু চাইছেন, সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেওয়া হোক। সূত্র বলছে, ‘বিজয় সফল হলে সরকার চালাবেন। আর যদি ব্যর্থ হন, তাহলে বৈধভাবেই অন্য কোনো বিকল্পের পথ সুগম হবে।’



