পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো নিউমার্কেটের দোকান
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে একাধিক দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিজেপির উগ্র কর্মীরা বুলডোজার নিয়ে বিজয় মিছিল করে এবং প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেটে হামলা চালায়।
পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মিছিল থেকে হামলা চালিয়ে একাধিক দোকান মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে ছোটাছুটি শুরু করেন। নিউমার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজ্যজুড়ে ব্যাপক হানাহানিতে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন।
বিজয় লুটে নেওয়া এবং এসব ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাজ্যে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সরাসরি সুপ্রিমকোর্টে যাচ্ছেন। কালীঘাটে দলীয় বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করব না। রাষ্ট্রপতিশাসন হলে হোক, আমাকে বরখাস্ত করা হোক।’ তার এই অবস্থান রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এ অবস্থার মধ্যে সরকার গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। শনিবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ব্রিগেড ময়দানে মন্ত্রিসভার শপথের আয়োজন চলছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, দলের তরফ থেকে সেই ভার দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তিনি এখন কলকাতায়। অমিত শাহকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে অমিত শাহর স্নেহধন্য জনপ্রিয় মুখ বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হওয়া ছাড়াও শুভেন্দুকেই তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয়ের মূল কারিগর বলা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বুলডোজার দিয়ে নিউমার্কেটের দোকান ভাঙা শুরু হয়। মার্কেটের একটি বড় অংশজুড়ে চালানো হয় ভাঙচুর। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক ব্যক্তি বলেন, কলকাতা পৌরসভার উলটোদিকে একটি কাপড়ের দোকানে প্রথম বুলডোজার চালানো হয়। মুহূর্তেই সেটি মাটিতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পাশেই ইউপি-বিহার নিউমার্কেটের একটি বড় খাবারের দোকান, যেখানে গরুর মাংসও পাওয়া যায়, সেটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় উচ্চৈঃস্বরে ডিজে চালানো হয় এবং বিজেপি কর্মীরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিচ্ছিল। পুরো এলাকা ছিল বিজেপির পতাকায় মোড়া। ভাঙচুর চালানোর সময় কলকাতা পুলিশের অসংখ্য সদস্যকে সেখানে দেখা যায় এবং পুরো ঘটনা পুলিশ সদস্যদের সামনেই ঘটে।
ভাঙচুরের পরদিন কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ জানিয়েছেন, বুলডোজার নিয়ে মিছিল করা যাবে না এবং যেসব মালিক এ ধরনের কাজে বুলডোজার ভাড়া দেবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলাফলের পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাওড়ার উদয়পুর ও রাজারহাট নিউ টাউনে দুই জন এবং বীরভূমের নানুর ও কলকাতার বেলেঘাটায় আরও দুইজন নিহত হয়েছেন। বীরভূম, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, নদিয়া, বাঁকুড়াসহ একাধিক জায়গায় দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়েছে এবং একাধিক জায়গায় তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুর হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আসানসোল শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রাজ্যের অন্যান্য স্থানেও তৃণমূলের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।
তবে নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কদের দাবি, সহিংসতা ও ভাঙচুরে তাদের কোনো কর্মী জড়িত নন এবং কোথাও কোথাও ‘দুষ্কৃতকারীরা’ বিজেপির নাম ব্যবহার করে ‘অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে’। সহিংসতা রুখতে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।



