ভারতে আঞ্চলিক দলগুলোর সংকট: ভোটাররা কেন জাতীয় দলের দিকে ঝুঁকছে?
ভারতে আঞ্চলিক দলগুলোর সংকট: ভোটাররা কেন জাতীয় দলের দিকে ঝুঁকছে?

পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় এবং তামিলনাড়ুতে ক্ষমতাসীন ডিএমকে-র অভাবনীয় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থান এক নতুন সংকটের মুখে পড়েছে।

কী ঘটছে?

তামিলনাড়ুতে টিভিকে নামের একটি নতুন আঞ্চলিক দল নির্বাচনি ময়দানে অভাবনীয় ভালো ফল করলেও, দক্ষিণের এই রাজ্যে সামগ্রিকভাবে আঞ্চলিক রাজনীতির যে আদি কাঠামো তা এক বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কারণ ডিএমকে ছিল তামিল আত্মপরিচয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন নিজে তামিল স্বার্থের পক্ষে জোরালো সওয়াল করছিলেন। তিনি তার নিজের আসনেই পরাজিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, ডিএমকে-র তামিল আবেগের ওপর ভিত্তি করে সাজানো নির্বাচনি প্রচারণাকে তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া সম্পূর্ণ পরাস্ত করেছে।

আঞ্চলিক রাজনীতির ওপর এটি সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় আঘাত। আম আদমি পার্টি টেকনিক্যালি একটি জাতীয় দল হলেও, তারা মূলত পাঞ্জাব এবং দিল্লির মতো নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বেশ শক্তিশালী ছিল। তবে দলটির আঞ্চলিক প্রভাব দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজিত হওয়ার পরপরই আম আদমি পার্টি তাদের ৭ জন রাজ্যসভা সদস্যকে হারিয়েছে, যারা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একইভাবে সিপিআই (এম)-ও কাগজে-কলমে একটি জাতীয় দল হলেও, বাস্তবে এটি কেবল কেরালা রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল এবং কার্যত একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কেরালায় আরেক জাতীয় দল কংগ্রেসের কাছে সিপিআই (এম)-এর পরাজয়ের অর্থ হলো একক একটি রাজ্যে টিকে থাকা আরও একটি আঞ্চলিক শক্তির বড় ধরনের পতন। এর আগে ২০২৪ সালের ওড়িশা নির্বাচনে নবীন পট্টনায়কের বিজু জনতা দলকে পরাজিত করে বিজেপি সেখানে পট্টনায়কের টানা ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে ২০২৪ সালের পর এই ধারার বিপরীতে গিয়ে ব্যতিক্রম তৈরি করেছে কেবল হেমন্ত সোরেনের ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা। যারা রাজ্যের গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারাতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়া জম্মু ও কাশ্মীরে ওমর আব্দুল্লাহর ন্যাশনাল কনফারেন্স নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য আদর্শ জায়গা নয়।

কেন আঞ্চলিকগুলো জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে?

গত দুই বছরের নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের রাজনীতিতে এখন আঞ্চলিক দলগুলো থেকে জাতীয় দলগুলোর দিকে ভোটারদের এক বড় ধরনের ঝোঁক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি উত্তরপ্রদেশে ৩৭টি আসনে জিতে এক অভাবনীয় সাফল্য পেলেও, সামগ্রিক এই পরিবর্তনের ধারাকে তা রুখতে পারেনি। এই পরিবর্তনটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বিরোধী দলগুলো বারবার ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাতের অভিযোগ তুলছে। তারা অভিযোগ করছে যে, কেন্দ্র সরকার রাজ্যগুলোর ন্যায্য তহবিল আটকে রাখছে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে লেলিয়ে দিচ্ছে এবং সর্বশেষ আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ভারতের ‘নির্বাচনি মানচিত্র’ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যা শেষ পর্যন্ত লোকসভায় দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের অংশ অনেকটাই কমিয়ে দেবে।

আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য কীভাবে ভাঙলো?

১৯৮৯ সালের পর যখন কংগ্রেসের একক আধিপত্যের অবসান ঘটে, তখন থেকে আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান শুরু হয়। যা পরবর্তী ২৫ বছর ধরে ভারতে জোট রাজনীতির এক সোনালী যুগ তৈরি করেছিল। এটি এমন এক সময় ছিল যখন উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের মতো বড় রাজ্যগুলোতেও আঞ্চলিক দলগুলোর একক আধিপত্য বজায় ছিল। এই জোট রাজনীতির যুগে এনডিএ এবং ইউপিএ উভয়কেই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আঞ্চলিক স্বার্থ ও দাবির প্রতি সবসময় সংবেদনশীল থাকতে হতো।

কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির উত্থান এই পুরোনো ভারসাম্যকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। বিজেপি খুব দ্রুতই পশ্চিম, মধ্য ও উত্তর ভারতে নিজেদের একক আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে; যার ফলে এসপি, আরজেডি, বিএসপি, শিবসেনা এবং এনসিপির মতো আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। এমনকি নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে শিবসেনা এবং এনসিপির মতো দলগুলো ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং দল দুটির যে অংশগুলো মূল প্রতীক পেয়েছে, তারা এনডিএ জোটে যোগ দেয়। অন্যদিকে বিহারে নীতীশ কুমারের জেডি (ইউ) কখনও এনডিএ, আবার কখনও বিরোধী জোটে গিয়ে কোনোমতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিহারেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতির দিকেই হাওয়া ঘুরেছে এবং ফলস্বরূপ সেখানে বিজেপির একজন মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।

বিরোধীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিরোধী দলগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তারা যখন জনসভায় ও রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বা রাজ্যগুলোর অধিকার নিয়ে কথা বলছে, তখন সাধারণ ভোটাররা প্রতি বছরই আঞ্চলিক দল ছেড়ে জাতীয় দলের দিকে, বিশেষ করে বিজেপির দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৯৯টি আসন পেয়ে কংগ্রেস নিজেদের অবস্থানের উন্নতি ঘটালেও, গত ১২ বছরে তারা বিজেপির সামনে নিজেদের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিরোধী ঐক্যের স্বার্থেই একাধিক দলকে এখন বারবার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাষা ও আঞ্চলিক স্বার্থের কথা বলতে হচ্ছে।

কেন্দ্র সরকারকে অভিযুক্ত করা কাজে আসছে না

বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন আইনি মামলাও এই আঞ্চলিক বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এসব কৌশল ভোটারদের আচরণে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের প্রতিটি চক্রেই বিজেপি অতীতের তুলনায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

বর্তমানে মূলত দক্ষিণ ভারতেই আঞ্চলিক দলগুলো এখনও কিছুটা প্রভাব ধরে রেখেছে। তবে সেখানেও তারা এখন তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। এমনকি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস সরাসরি ভারত রাষ্ট্র সমিতিকে পরাজিত করেছে, যে আঞ্চলিক দলটিকে এক সময় তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের একমাত্র রূপকার হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হতো।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩০৩ থেকে ২৪০টি আসনে নেমে আসায় যে ধারণা করা হয়েছিল যে দলটির ক্ষমতা কিছুটা কমে যাবে, তা এখনও পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিজেপির দুই প্রধান শরিক জেডি (ইউ) এবং টিডিপি তাদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো থেকে বিরত রয়েছে। লোকসভায় সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিলের পতনের সময়ও তারা বিজেপির পাশেই দাঁড়িয়েছিল। যদিও বিরোধীদের পক্ষ থেকে তখন সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, এই বিলটি মূলত আসন পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল মাত্র।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস