বাংলাদেশে বর্ষার আগমন: প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ ও বন্যার শঙ্কা
বাংলাদেশে বর্ষার আগমন: প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ ও বন্যার শঙ্কা

আকাশে সজল সঘন মেঘের ভেলা, বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ আর দূরে কোথাও নিঃসঙ্গতার মুদ্রায় বৃষ্টির ধুমল শব্দ বর্ষা তার আগমনি বার্তা আগেই পৌঁছে দিয়েছে প্রকৃতির বুকে। ‘আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহবল/ মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে তীরে নারকেলসারি/ বৃষ্টিতে ধূমল;  —বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতার নিটোল-সজল-নিবিড় প্রকৃতির লাবণ্য স্নিগ্ধ এক বর্ষাকালের দৃশ্যপটের ভেতর জ্যৈষ্ঠের মধুর দহনকালের যবনিকা হয়েছে। বাংলাদেশ পা রাখল বর্ষার বৃষ্টি ধূমল চৌকাঠে। বাংলার প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের পিঙ্গল জটা ভেদ করে জীমূত-মন্দ্রে বর্ষার এলো আষাঢ়। কবি বলেছেন, ‘বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।’ প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের পিঙ্গল জটা ভেদ করে জীমূত-মন্দ্রে বর্ষার কাল নিয়ে এলো আষাঢ়। আষাঢ়ে জলভারানত ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশির ওপর ভর করে বিরাট দৈত্যের মতো প্রকৃতিতে নামে বর্ষা। বর্ষার আগমনি বেজে ওঠে মেঘের গুরু গুরু গর্জনে। তৃষ্ণায় কাতর শস্য-খেত, বৃক্ষরাজি, লতাগুল্ম আর প্রাণীকুল বর্ষার অঝোর বর্ষণে ফিরে পায় প্রাণের গভীর স্পন্দন।

আষাঢ়ের প্রথম দিন: বর্ষার সৌন্দর্য ও সাহিত্যে তার প্রভাব

বৈষ্ণব কবির ভাষায়—আজ ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুং’..। পঞ্জিকার অনুশাসনে আজ আষাঢ়ের পয়লা দিন। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে বর্ষার দিন এলো। বর্ষায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাউল হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত। তিনি গেয়েছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মত নাচেরে, আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে..। ‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/জল সিঞ্চিচ ক্ষিতি সৌরভ রভসে/ ঘন গৌরবে নবযৌবনা বরষা.’। আষাঢ়ে প্রকৃতি ‘সজল শ্যাম ঘন দেয়া’কে সাদর সম্ভাষণ জানায়, আর সর্বত্রই ছড়িয়ে দেয় এক অনুপম সুরধ্বনির অনুরণন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকৃতি ও প্রাণীর বর্ষা বরণ

প্রকৃতি, মানুষ ও সব প্রাণীই যেন আগমনি গান গেয়ে বরণ করে নেয় নবীনা বরষার শ্যাম গম্ভীর সরসারূপকে। ‘বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ইঙ্গিতে দশ দিক হাসায়ে’ এই বুঝিবা বর্ষার নিকট প্রকৃতির একান্ত আকুতি। মহাকবি কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যক্ষ মেঘকে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহ কাতর চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে। তাই রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের উদ্দেশে লিখেছিলেন: ‘কবিবর কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত।’ বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয় এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্ষার রূপ ও প্রকৃতির পরিবর্তন

কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ আর কদমফুলের চোখ জুড়ানো শোভা অনুষঙ্গ হয়ে আছে আষাঢ়ের। কদম কেতকী ফুটবে, আকাশ জুড়ে মেঘের আনাগোনা দ্রিমিকি দ্রিমিকি রবে। এমন দিনে ‘মুহূর্তে আকাশ ঘিরি রচিল সজল মেঘস্তর আর তাতে ‘রিক্ত যত নদীপথ’ ভরে যাবে ‘অমৃতপ্রবাহে’। ...মরুবক্ষে তৃণরাজি/পেতে দিল আজি/শ্যাম আস্তরণ।...গুরু গুরু মেঘগর্জে ভরিয়া উঠিল বিশ্বময়। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। আষাঢ়ে জলভারানত ঘন কৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনো-বা ‘প্রাণনাথে’র মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা।

বর্ষা উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন

একমেবাদ্বিতীয়ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বরষা এসেছে সামগ্রিক রূপবিভঙ্গে, আষাঢ়ের প্রথম দিবসটি তার কণ্ঠে :’ আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে/এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের ‘পরে/ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে/এসেছে এসেছে’ এই কথা বলে প্রাণ, ‘এসেছে এসেছে’ উঠিতেছে এই গান/ নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।... আষাঢ়ে প্রকৃতি ‘সজল শ্যাম ঘন দেয়া’কে সম্ভাষণ। রূপ-রঙে হয়ে ওঠে ঢল ঢল। আকুতি জানায়-বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ঈঙ্গিতে দশদিক হাসায়ে;’।

দাবদাহে চৌচির মাঠ ঘাট খালবিল বন-বিথিকায় জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দ। চারি ধারে অথৈ থৈ থৈ পানিতে আবহমান বাংলার রূপ হয় অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতা। বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত মধ্যযুগের কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দে মেঘমেদুর বরষায় শ্যামল বনভূমি আর তমাল তরুছায়াঘন পৃথিবীর নয়ন মনোহর রূপ: মেঘৈর্মে দুরম্বম, বনভুব শ্যামন্তরাল মালদ্রুমৈ..’। ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মন্দাক্রান্তা ছন্দে লেখা ‘যক্ষের নিবেদন’ কবিতায় আছে বর্ষার অসাধারণ অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা:‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল কই গো কই মেঘ উদয় হও/ সন্ধ্যার তন্দ্রার মুরতি ধরি আজ মন্দ্র মন্থর বচন কও’।

দেশে অনেক জনপদে গত ক’দিনের প্রকৃতি রবী ঠাকুরের কবিতা বিমূর্ত হয়ে এঁকে দিয়েছে:‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে/   বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর/কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনায়েছে দেখ্ চাহি রে...। বরষা মানবচিত্তে এক অতলস্পর্শী অপার্থিব বেদনার রূপকল্প বয়ে আনে যেন। দূর অতীতের বিস্মৃত কোন স্মৃতি বৃষ্টি ধারায় স্নাত হয়ে মনের পর্দায় ভেসে আসে, বর্ষার রূপবৈচিত্র্যের কারণে চোখ কানের ওপর ভর করায় দূর বিক্ষিপ্ত কোন আনন্দ বেদনার রেশ ঝংকার তোলে চিত্তধামে।

বর্ষার প্রভাব: কাব্য থেকে বাস্তবতা

আকাশ ভাঙা জলধারার সুর মূর্ছনা শিল্পীর মনে এমন এক আবেশ রচনা করে যা ‘মধুরম, মধুরম’ বোল তুলে তাকে সৃজনছন্দে ও আনন্দে মাতিয়ে দেয়। প্রচণ্ড দাবদাহে চৌচির হয়ে যাওয়া মাঠে ঘাটে খালে বিলে রাস্তাঘাট মায় কুঞ্জকাননে কিংবা বন বীথিকায় জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দ। চারিধার থই থই পানি ধারণ করে বর্ষা বাংলায় আসে অপরূপ মায়াবী সলিল কন্যার সাজে। বর্ষা অনন্ত যৌবনা চিরকৌতুকময়ী এক দুরন্ত মেয়ের নৃত্য বিভঙ্গের মাধুরী ছড়ায়। বিচিত্র এর রূপ, অদ্ভুত এর প্রকৃতি। টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে, নদীতে জাগে বান। বর্ষার ঝরঝর সারাদিন সারারাত অবিরাম ঝরে। প্রাণে ছড়ায় হিল্লোল বাতাসে লাগে জলদগম্ভীর প্রণোদনা।

বর্ষা মানব মনে বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দিলেও হতদরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ ও দুর্বিপাক বয়ে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন বর্ষা আর গ্রীষ্মকে আলাদা করে চিহ্নিত করা দিনে দিনে দুরূহ হচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল। তবুও কর্মহীন দিবস রজনী, উদাস মনের তোলপাড়, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আর ‘দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি..’ বর্ষা কে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। যাপিত জীবনের ভালো আর মন্দের মিলিত ছায়ার মতো রোদ আর বৃষ্টির যুগলবন্দিতে আগত বর্ষার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালেও প্রতিধ্বনি তুলে কোনো না কোনো কবিতা কিংবা গান, জাগায় আশাবাদের প্রতীতি:’ যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো/যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরি/কদম গুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি/উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কালো/ছলকে ছলকে নাচিবে বিজলী আরো/তুমি চলে এসো, চলে এসো, এক বরষায়...।

বর্ষা উৎসব ও বন্যার শঙ্কা

এখন খেয়ালী প্রকৃতির মতিগতি দেখে মনে হতে পারে, আষাঢ়-দিনের বর্ষাবন্দনা অদ্ভুত, মিথ্যা, অলীক আর ‘আষাঢ়ে গল্পে’র মতোই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ষা বরণ করে নিতে নেওয়া হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। সামাজিক মাধ্যমেও বর্ষার স্মৃতি, অনুভূতি ও শুভেচ্ছায় মুখর থাকবেন অনেকে। নদীমাতৃক বাংলার কৃষিজীবন, লোকসংস্কৃতি, গান, কবিতা ও চিত্রকলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেঘ-বৃষ্টির অগণিত গল্প। বর্ষা উত্সব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছর ধরে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে ‘বর্ষা উত্সব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় এবারও আয়োজিত হচ্ছে ‘বর্ষা উত্সব-১৪৩৩’।

টানা বৃষ্টিতে বন্যার শঙ্কা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভুগাই ও কংস নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে ভুগাই, কংস ও আশপাশের নদীগুলোর পানি আরো বাড়তে পারে।