১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল রাত ২টা ২০ মিনিটে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যায় আরএমএস টাইটানিক। কয়েক হাজার টন ইস্পাতের এই জাহাজকে চূর্ণ করেছিল একটি হিমবাহ। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ড্যানিয়েল স্টোনের ‘সিংকেবল’ বইতে উঠে এসেছে সেই ঘাতক হিমবাহের নাটকীয় জীবনকাহিনি।
হিমবাহের জন্ম: ১৫ হাজার বছর আগে গ্রিনল্যান্ডে
টাইটানিক ডুবিয়ে দেওয়া হিমবাহের গল্প শুরু হয় প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে, গ্রিনল্যান্ডের বরফচাদরে। তখন পৃথিবীতে আধুনিক সভ্যতার চিহ্ন ছিল না। বরফচাদরের ওপর তুষারপাতের মাধ্যমে প্রতিটি তুষারকণা ধূলিকণাকে কেন্দ্র করে জটিল স্ফটিক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে তুষারস্তর জমাট বেঁধে প্রায় দুই মাইল পুরু বরফের স্তরে পরিণত হয়। প্রবল চাপে তুষার স্ফটিকগুলো তাদের আদি আয়তনের এক-তৃতীয়াংশে সংকুচিত হয়ে পাথরের মতো শক্ত বরফে রূপান্তরিত হয়।
১৯০৯: হিমবাহ ও টাইটানিকের নির্মাণ
হাজার হাজার বছর ধরে বরফখণ্ডটি বছরে প্রায় চার মাইল বেগে গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। ১৯০৯ সালের গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ডের একটি হিমবাহ থেকে বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে সাগরে পড়ে। জন্মের সময় এটি ছিল প্রায় দুই মাইল চওড়া এবং ১০০ ফুট লম্বা—রোমের কলোসিয়াম বা মিসরের সব পিরামিডের চেয়েও বড়।
একই বছরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে শুরু হয় টাইটানিকের নির্মাণকাজ। হোয়াইট স্টার লাইন তাদের তিনটি বিশাল জাহাজের একটি হিসেবে টাইটানিককে তৈরি করছিল আভিজাত্য আর শক্তির প্রতীক হিসেবে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই নির্মাণযজ্ঞে ব্যয় হয় তৎকালীন বিপুল অর্থ। টাইটানিকের সবচেয়ে দামি টিকিটের দাম বর্তমান মূল্যে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের বেশি ছিল।
যাত্রা ও সংঘর্ষ
১৯১২ সালের শুরুতে টাইটানিক নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে, তখন তার ভেতরে ছিলেন ২ হাজার ২০০-এর বেশি যাত্রী ও ক্রু। অন্যদিকে সেই নামহীন হিমবাহটি আর্কটিক সাগরে তিন বছর কাটিয়ে ‘ল্যাব্রাডর কারেন্ট’ বা শীতল স্রোতের কবলে পড়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে আসে।
১৮৫৭ সালে বিজ্ঞানী জন থমাস টওসন লক্ষ করেছিলেন, বছরের পর বছর প্রবল চাপে তৈরি হওয়া হিমশৈল সাধারণ পাথরের চেয়ে কোনো অংশে কম শক্ত নয়। ১৯১২ সাল নাগাদ নিউফাউন্ডল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অনেক বেশি হিমশৈল দেখা যেত। মার্কিন কোস্টগার্ড সেই এলাকার নাম দিয়েছিল আইসবার্গ অ্যালি। সাধারণত উত্তর গোলার্ধের হিমশৈলে মাত্র ১ শতাংশ গালফ স্ট্রিমের উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় টিকে থাকতে পারে। হাজার হাজার হিমশৈলের মধ্যে মাত্র ১টি ৪১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা ট্রান্স-আটলান্টিক জাহাজ চলাচলের পথে পড়ে। টাইটানিকের ঘাতক সেই হিমশৈল ছিল সেই হাতে গোনা কয়েকটির একটি।
টাইটানিকের ডুবি ও হিমবাহের শেষ
টাইটানিক যখন ডুবছিল, তখন এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই মাইল গভীরে তলিয়ে যায় এবং ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মাইল বেগে সমুদ্রের তলদেশে আছড়ে পড়ে। ৭৩ বছর পর ১৯৮৫ সালে উন্নত সাবমেরিনের সাহায্যে এর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এই ঘটনা না ঘটার সম্ভাবনা। তিন বছর ধরে সাগরে ভাসতে থাকা সেই হিমশৈল উষ্ণ জলে এসে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল। আঘাত হানার সময় সেটির আয়ু বড়জোর আর এক থেকে দুই সপ্তাহ বাকি ছিল। ড্যানিয়েল স্টোনের মতে, ‘যদি টাইটানিক এক ঘণ্টা পরে পৌঁছাত বা হিমশৈলীটি কয়েক শ ফুট দূরে থাকত, তবে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।’ টাইটানিক তার প্রথম যাত্রা শেষ করে স্বাভাবিকভাবেই বন্দরে ভিড়ত।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন



