কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডির ২২ বছর: এক মিনিটে থেমে গেল শত প্রাণের স্পন্দন
কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডির ২২ বছর, এক মিনিটে শত প্রাণহানি

কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডির ২২ বছর: এক মিনিটের ঘূর্ণিঝড়ে শত প্রাণের বিদায়

আজ ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের প্রথম দিনে চারদিকে উৎসবের আমেজ, আনন্দ আর নতুন স্বপ্নের সূচনা। কিন্তু নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার মৌগাতি ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর ও আশপাশের প্রায় ২৫টি গ্রামের মানুষের কাছে এই দিনটি এক গভীর শোকের স্মৃতি বহন করে। আজ থেকে ঠিক ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালের এই দিনে, গোধূলি সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের এক ভয়াবহ টর্নেডো পুরো জনপদকে তছনছ করে দিয়েছিল। ইতিহাসে যা ‘কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডি’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

সেদিনও ছিল নববর্ষ, মুহূর্তেই মৃত্যুর মিছিল

সেদিনও ছিল নববর্ষের দিন। গ্রামের মানুষজন উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। কেউ নতুন পোশাকে সেজেছিলেন, কেউ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আনন্দে মেতে ছিলেন। ঠিক সেই সময় পশ্চিম আকাশে অদ্ভুত লাল আভা চোখে পড়ে অনেকের। কেউ বুঝে ওঠার আগেই আচমকা আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে যায় ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়ে শত শত গাছ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ফসলি জমি। কাঞ্চনপুরের ভাওয়াল বিলের পানি পর্যন্ত বাতাসে উঠে গিয়ে দূরের জমিতে ছিটকে পড়েছিল। বিলের মাছ পাওয়া গিয়েছিল আধা কিলোমিটার থেকে এক কিলোমিটার দূরে।

ঝড়ের তাণ্ডবে মানুষ ছিটকে পড়ে দূরদূরান্তে। কোথাও মিলেছে মস্তকবিহীন মরদেহ, কোথাও আবার নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় পাওয়া গেছে লাশ। চারদিকে তখন শুধু আহাজারি, আর্তনাদ আর শোকের মাতম। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নারী-শিশুসহ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। নবদম্পতি, কোলের শিশু, বৃদ্ধ— কেউই রক্ষা পাননি। এমনকি কনে দেখতে এসে প্রাণ হারান পাত্রপক্ষের লোকজনও। আনন্দের দিন মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুর মিছিলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেঁচে যাওয়া মানুষের স্মৃতিতে এখনো ভাসে সেই ভয়াল সন্ধ্যা

কাঞ্চনপুর গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল মিয়া বলেন, ঝড়ে আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হাসপাতালের শয্যায় দেখতে পান। কৃষক হাদিস মিয়ার স্মৃতিতে এখনো ভাসে সেই সন্ধ্যা। তিনি বলেন, আকাশের অবস্থা খারাপ দেখে ঘরে ছিলেন। হঠাৎ ঝড়ে সবকিছু উড়ে যায়। তার ধানের গোলা গিয়ে ঝুলে পড়ে গাছের ডালে। ঝড়ের সময় নিখোঁজ হয়ে যায় তার দুই বছরের মেয়ে তাসলিমা। পরে ঘরের ধরনার নিচে বালিশ চাপা অবস্থায় তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

তৎকালীন ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম জানান, আহতদের উদ্ধার করার সময় বোঝার উপায় ছিল না কে জীবিত, আর কে মৃত। এই ট্র্যাজেডির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনাও। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া এক দুধের শিশুকে তিন দিন পর ধানখেত থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যা অনেকেই অলৌকিক বলে মনে করেন।

দুদশক পরেও তাজা ক্ষত, তবে নতুন জীবনের লড়াই

দুদশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কাঞ্চনপুরের দৃশ্যপট বদলেছে। পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ, উন্নত যোগাযোগ সব মিলিয়ে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু মানুষের মনে সেই দিনের ক্ষত এখনো তাজা। গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মিয়া বলেন, এখনো পশ্চিম আকাশে কালো মেঘের সঙ্গে লাল আভা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয়, আবার বুঝি ফিরে আসছে সেই ভয়াল সন্ধ্যা।

তবুও থেমে থাকেননি তারা। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে গড়ে তুলেছেন নতুন জীবন। এখন তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়। প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি ‘কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। মসজিদ ও মন্দিরে দোয়া, মিলাদ ও প্রার্থনার মাধ্যমে স্মরণ করা হচ্ছে নিহতদের। কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি মানুষের অদম্য সাহস, বেঁচে থাকার লড়াই এবং শোক থেকে উঠে দাঁড়ানোর এক অনন্য গল্প।