কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে ডুবে গেছে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ও সড়ক। কোথাও হাঁটু ও কোথাও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন নগরীর লোকজন। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির শেষ ছিল না। কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্র হাঁটু সমান পানিতে ডুবে গেছে। এ অবস্থায় বেঞ্চের ওপরে পা তুলে পরীক্ষা দিতে দেখা যায় পরীক্ষার্থীদের।
পরীক্ষা কেন্দ্রে পানিবন্দি শিক্ষার্থীরা
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায়, জলাবদ্ধতায় বেঞ্চে পা তুলে পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। হল পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকাও চেয়ারে পা তুলে বসে আছেন। জেলা আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকা তলিয়ে গেছে
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সকালে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে নগরীর আদালত সড়ক, লাকসাম সড়ক, সালাউদ্দিন মোড়, মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, রেইসকোর্স এলাকা, ঈদগাহ সড়ক, অশোকতলা, মগবাড়ি চৌমুনী, কালিয়াজুড়িসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এ ছাড়া কোথাও কোথাও বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে যায়। পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়ে মানুষ। বিশেষ করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। পাশাপাশি টানা বর্ষণে ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পরীক্ষা
বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী ও তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকরা। বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ চলে যায়। কোনও কোনও কেন্দ্রে মোমবাতি ও চার্জলাইট জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেক কেন্দ্রে পানি জমে যাওয়ায় এক-দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের হাঁটু ও কোমর সমান পানি মাড়িয়ে কেন্দ্র থেকে বের হতে দেখা যায়।
অভিভাবক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা শেষে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে অভিভাবক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিট পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর মোমবাতি ও চার্জার লাইট দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই কেন্দ্রে পানি ঢুকে যায়। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে লিখতে হয়েছে। কেউ কেউ বেঞ্চের ওপরে পা তুলে লিখেছে।’
নগরীর মগবাড়ি চৌমুনী এলাকার ব্যবসায়ী আবদুস সালাম বলেন, ‘বৃষ্টিতে দোকানে পানি ঢুকে সব ভিজে গেছে। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং ভবিষ্যতে যেন বৃষ্টির পানি জমে জনদুর্ভোগ তৈরি না হয়, সে উদ্যোগ নেওয়া।’
সিটি করপোরেশনের পদক্ষেপ
তবে নগরীর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানালেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ড্রেন ও খালের মুখগুলো পরিচ্ছন্ন করে দ্রুত পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। যেসব ড্রেনের মাধ্যমে নগরীর পানি বহির্গমন করে সেসব ড্রেন ও খাল তাৎক্ষণিক পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশেই কমে আসবে। তবে বিকাল পর্যন্ত নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। সেসব এলাকায় মানুষকে ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
কৃষি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষতি
এদিকে ভারী বৃষ্টিপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ে ধানসহ অন্যান্য শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, বরুড়া, বুড়িচং উপজেলা থেকে ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব উপজেলায় গাছপালা ভেঙে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি বলেন, ‘উপজেলার ভবানীপুর, এগারোগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি গাছ ভেঙে পড়েছে। সেগুলো অপসারণ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। সেগুলো আবারও সংযোগ দিতে কাজ করছে পল্লী বিদ্যুৎ।’
তবে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ত্রাণ ও দুর্যোগ দফতর। কুমিল্লা আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির এই পরিস্থিতি আরও দুই-তিন দিন চলমান থাকতে পারে।



