কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু, ভারী বর্ষণ আরও দুই দিন অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস
কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু, ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস

গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে অতিবর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন এবং কক্সবাজার সদরে ১ জন রয়েছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আরও দুই দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

পাহাড়ধসে নিহতদের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে রোববার দিবাগত রাতে পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে রোহিঙ্গা মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪) নিহত হন। উখিয়া ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ারসার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে স্বামী-স্ত্রী-সন্তানসহ ৩ জনকে মৃত ও ২ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে।

একই রাত ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটি চাপায় একরাম (৭) নামে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সর্বশেষ রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন- আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রশিদের ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ সময় আহত হন আরও একজন।

কক্সবাজার সদরে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতি

সোমবার ভোরে কক্সবাজার সদরের পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর (৪৬) নামে একজনের মৃত্যু হয়। এ সময় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে একই পরিবারের আরও ৩ জন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে। আলী আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতিবৃষ্টিতে কক্সবাজারের ঈদগাঁও বাজার, ফসলি বিল, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, পেকুয়া, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প, আলীরজাহাল, এসএমপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, পর্যটনজোন, মহেশখালীর নিম্নাঞ্চল বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ

আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারে রোববার বেলা ১২টা থেকে সোমবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬৭ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আরও দুই দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও দুর্যোগ মোকাবিলা

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ভারী বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ জন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। বৃষ্টি চলমান থাকায় পাহাড়ধসের আরও আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। গত বছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়, এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে আশা করেন তিনি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ভারী বর্ষণের আভাস পাওয়ার পর থেকেই সবখানে সতর্কতার আগাম বার্তা দেওয়া হয়। এরপরও রোববার দিনগত রাতে এবং সোমবার ভোরে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন এবং কক্সবাজার শহরে একজন মারা গেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং অব্যাহত রেখেছি। ভারী বর্ষণ যেহেতু আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, জেলা ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করা হয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।

ঝুঁকিতে থাকা মানুষের আতঙ্ক

ঝুঁকিতে থাকা ক্যাম্প ৯ এর বাসিন্দা মাবিয়া খাতুন বলেন, সমতলে জায়গা পায়নি। তাই পাহাড়ে ঘর করেছি। পাহাড়ের উপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় ধসে পড়বে ভয়ে থাকি। বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধসের আশঙ্কায় সময় কাটে।