যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হবে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
যুদ্ধের ভুল হিসাব
ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন ইরান যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং তাঁরা সহজেই জয়ী হবেন। কিন্তু তাঁদের সেই হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে শত্রুদের দমানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
উপসাগরীয় জোটে ফাটল
এ যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোট বা বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে আরব দেশগুলো নিজেদের ‘স্থিতিশীলতার প্রতীক’ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এ যুদ্ধের কারণে তাদের সেই স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এতটাই নষ্ট হয়েছে যে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বহু বছর লেগে যাবে।
এসব দেশের কর্মকর্তারা এখন গোপনে জোট পরিবর্তনের কথা বলছেন। তারা সমুদ্রের ওপারের দেশ ইরানের সঙ্গে মানিয়ে চলার পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া
ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর থেকে বড় চাপ কমবে। বিশ্বজুড়ে চরম সংকটে থাকা কোটি কোটি মানুষের জীবনেও স্বস্তি ফিরবে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া সমঝোতাকে পূর্ণাঙ্গ ‘শান্তিচুক্তি’ বলা যাবে না। দুই পৃষ্ঠার এ দলিলে ১৪টি পয়েন্ট রয়েছে। এখনো এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এ সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ছে এবং ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ উঠে যাচ্ছে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
চলমান এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, গ্যাস ও সার সরবরাহের কাজ ব্যাহত হয়েছে। ফলে বছরের শেষ নাগাদ গরিব দেশগুলোতে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ অঞ্চলের দেশগুলো চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে অতর্কিতে কয়েকটি ধ্বংসাত্মক হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা নিহত হন। তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় একই সময় দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলায় ১৫০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। তাদের বেশির ভাগের বয়স ১২ বছরের নিচে।
ইরানের নতুন নেতৃত্ব
আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দ্রুত দেশের দায়িত্ব নেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একঝাঁক তরুণ কমান্ডার। তাঁরা আগের নেতাদের মতোই কট্টর আদর্শবাদী, তবে লড়াইয়ের ময়দানে অনেক বেশি বেপরোয়া। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁরা যেকোনো বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরান পরিকল্পিতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে তেহরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোসহ মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে হামলা চালায়।
ইসরায়েলের হতাশা
এই যুদ্ধে ইসরায়েল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অংশীদার। কিন্তু সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনার সময় তাদের দূরে রাখা হয়। ফলে এ চুক্তিকে এখন চরম হতাশার সঙ্গে দেখছে ইসরায়েল।
২৮ ফেব্রুয়ারি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি সারা জীবন এ সুযোগের (ইরান যুদ্ধ) জন্যই অপেক্ষা করেছেন। তিনি ইরানের বর্তমান সরকারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। তবে এখন উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগে এখন নিজ দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।
ভবিষ্যৎ আলোচনা
সবচেয়ে জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ বিষয়গুলো আপাতত ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। ওই আলোচনার মূল সূচিতে থাকবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। এ ছাড়া বিভিন্ন শর্ত মানার বিনিময়ে ইরান ঠিক কতটা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে, তা-ও পরে নির্ধারণ করা হবে।
আপাতত দুই পক্ষই (ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র) একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে এ সমঝোতা স্মারক বড় কোনো চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। এমন চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে যেত। কিন্তু আস্থার সংকট ও আদর্শিক লড়াইয়ের কারণে এটি এখনো এক ‘আকাশকুসুম কল্পনা’ হয়ে আছে।
পুরো ঘটনা সবার জন্যই দুঃখজনক একটি অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। ট্রাম্প ইরানি জনগণকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা এখনো সেই কঠোর শাসনের মধ্যে আছেন। তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গত জানুয়ারিতেও রাজপথের আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছে। তাতে প্রাণ গেছে অনেকের।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এখনো প্রবল। তবে ট্রাম্পের এ হুট করে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত একটি বার্তাই দিচ্ছে। আর তা হলো, পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তারা হিমশিম খাচ্ছে।



