প্রায় এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আজ সোমবার থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর থেকে ইঙ্গিত মিলছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই কৌশলগত জলপথে ইরানের অবরোধ ভাঙতে উদ্যোগ নেবে।
প্রজেক্ট ফ্রিডম অভিযান
গতকাল রোববার ট্রাম্প বলেছেন, যেসব দেশের জাহাজ প্রণালিতে আটকে আছে তাদের অনুরোধে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের এ অভিযান চালানো হবে। তিনি এ জাহাজগুলোকে ‘নিরপেক্ষ ও নির্দোষ যাতায়াতকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভালোর কথা ভেবে আমরা ওই দেশগুলোকে বলেছি, আমরা তাদের জাহাজগুলোকে এই সীমাবদ্ধ জলপথ থেকে নিরাপদে বের করে আনতে দিকনির্দেশনা দেব। তারা যেন নির্বিঘ্নে এবং দক্ষতার সঙ্গে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে এটা করা হবে।’ তবে কোন কোন দেশ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছে, তা ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে বলেননি।
মানবিক পদক্ষেপ নাকি কৌশল?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘এসব জাহাজের অনেকগুলোতেই খাবারসহ ক্রুদের সুস্থ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জাহাজে থাকার প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এই অভিযানে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।’ ট্রাম্প যদিও এই উদ্যোগকে একটি মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবে এই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে বা এতে তেহরানের সঙ্গে কোনো সমন্বয় থাকবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের ঘোষিত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরান রুখে দাঁড়ালে তা চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। গত ৭ এপ্রিল থেকে নাজুক এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে। এদিকে ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো মার্কিন হস্তক্ষেপকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আজিজি লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর পোস্টগুলো দিয়ে হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগর এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। এ ধরনের দোষ চাপানোর কৌশলে কেউ বিশ্বাস করবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতি
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, সোমবার থেকে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করতে চাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সহযোগিতা শুরু করবে। সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এই প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে সহায়তা দেওয়াটা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আমরা নৌ অবরোধ বজায় রাখব।’ তবে কীভাবে এই জলপথে জাহাজগুলোর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনী বলেছিল, তারা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ, সেখানে ইরানের ভূখণ্ড থেকে হামলার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
প্রায় এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে পেট্রলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ৪৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ৩ ডলারেরও কম ছিল। এতে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়ছে। জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় জনগণের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের পূর্বের অবস্থান
ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান অবরোধ পরিস্থিতিতে তিনি সন্তুষ্ট। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বোমা হামলার চেয়েও বেশি কার্যকর।’ ইরানের অবরোধের বিপরীতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ছিল, তা আবারও বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক সমাধানের পথ
ট্রাম্প রোববার বলেছেন, সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমি সম্পূর্ণভাবে জানি, আমার প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে খুব ইতিবাচক আলোচনা চালাচ্ছেন। এই আলোচনা সবার জন্যই ইতিবাচক কিছু বয়ে আনতে পারে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘জাহাজ চলাচল মূলত সেসব মানুষ, কোম্পানি ও দেশগুলোকে মুক্ত করার জন্য, যারা কোনো ভুল করেনি—তারা কেবল পরিস্থিতির শিকার।’



