পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল সোমবার, মমতা ও বিজেপির লড়াই
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল সোমবার, মমতা-বিজেপি লড়াই

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল সোমবার প্রকাশ করা হবে। পুরো ভারতের নজর এখন কেবল এই ফলের দিকেই নিবদ্ধ। এই নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান ও টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছেন, নাকি এই প্রথম কোনও গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব ভারতীয় রাজ্যে ক্ষমতার রাশ নিজেদের হাতে নিতে চলেছে বিজেপি।

ভোটার তালিকা বিতর্ক ও রেকর্ড ভোট

দুই দফায় অনুষ্ঠিত এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। বেশিরভাগ বুথফেরত জরিপ এবার এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে এবং এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সংস্থা বিজেপিকে কিছুটা এগিয়ে রেখেছে।

তবে এবার ২৯৪ আসনের রাজ্য বিধানসভার এই নির্বাচন সম্পূর্ণ এক নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন বা স্পেশাল ইনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কার্যক্রমকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুনানির পর বাদ দেওয়া হয়েছে ২৭ লাখেরও বেশি ভোটারকে, যাদের আপিল নিয়ে ১৯টি ট্রাইব্যুনালে অনির্দিষ্টকালের জন্য শুনানি অব্যাহত থাকবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছরের নভেম্বর থেকে নির্বাচন কমিশন আরও ৮টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর চালালেও, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম ছিল একদম ব্যতিক্রমী। এখানে যৌক্তিক অসঙ্গতি নীতি প্রয়োগ, মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ থেকে শুরু করে শুনানি ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের মতো নানা নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই এসআইআর-এর বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন। ভোটার তালিকা থেকে ভোটার বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে এবং এসআইআর-এর প্রতিবাদে ভোটারদের এই রেকর্ড উপস্থিতিকে তিনি ‘গণবিক্ষোভ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন যে এর সুফল তার দলই পাবে।

অন্যদিকে, বিজেপি এসআইআর প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে রেকর্ড ভোট পড়াকে তারা তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতার হাওয়া এবং পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের রায় হিসেবে দেখছে।

তৃণমূলের অগ্নিপরীক্ষা

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরদিন এক ভিডিও বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন যে, তার দল এবার ২০০-র বেশি আসন পাবে এবং এমনকি তা ২৩০ পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলো ১৪৮।

তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর অনুযায়ী, দলটির লক্ষ্য হলো ২০০-র কাছাকাছি আসন নিয়ে এক ‘নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ অর্জন করা; যাতে পরবর্তীতে বিজেপির পক্ষ থেকে ‘অপারেশন লোটাস’-এর মাধ্যমে দলবদল করানোর যেকোনও ধরনের অপচেষ্টা থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১৫টি আসনে জিতেছিল। এর বিপরীতে ৩৮ শতাংশেরও বেশি ভোট নিয়ে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন।

তৃণমূলের জন্য এবার তাদের প্রধান দুর্গ দক্ষিণবঙ্গে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের ১০১টি মূল আসনে জেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে দলটির অন্যতম প্রধান শক্তি মুসলিম ভোট ব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখাও তাদের জন্য এক বড় পরীক্ষা।

মমতার অস্তিত্বের লড়াই

এই নির্বাচনটিকে মূলত ‘মমতার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি তার লড়াকু মনোভাব এবং লড়াকু রাজনীতির জন্য ভারতজুড়ে সমাদৃত। তিনি যদি এবার চতুর্থবারের মতো বিধানসভা নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন, তবে জাতীয় স্তরে শীর্ষ বিরোধী নেতাদের মধ্যে তার রাজনৈতিক মর্যাদা আরও অনেক উঁচুতে উঠবে।

এবার দক্ষিণ কলকাতার নিজের ঐতিহ্যবাহী ভবানীপুর কেন্দ্রেও মমতা তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিজেপির প্রধান মুখ ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছ থেকে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। গত ২৯ এপ্রিল এই কেন্দ্রের ভোটের দিনও চরম নাটকীয়তা দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, আগের দিন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশন তার দলের নেতাকর্মীদের ‘হয়রানি’ ও ‘আটক’ করেছে।

২০১১ সাল থেকে মমতা ভবানীপুর আসনে জিতে আসছেন। অন্যদিকে শুভেন্দু তার নিজের দুর্গ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকেও লড়ছেন, যেখানে ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। নন্দীগ্রামে হেরে যাওয়ার পর মমতা একই বছরে ভবানীপুর আসনের উপনির্বাচনে ৫৮ হাজার ৮৩৫ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর বিজেপি এবার নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়েছে। কারণ সেই নির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভা এলাকায় তৃণমূলের ব্যবধান কমে মাত্র ৮ হাজার ২৯৭ ভোটে দাঁড়িয়েছিল।

বিজেপির চ্যালেঞ্জ

২০২১ সালে বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়েছিল। যা রাজ্যে দলটির এযাবৎকালের সেরা পারফরম্যান্স। এর মাধ্যমে তারা সিপিআই (এম) এবং কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

এবার বিজেপি কেবল ১০০-র গণ্ডি পার হওয়ার জন্যই নয়, বরং ম্যাজিক ফিগার অর্জন করতে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে। বিজেপি শিবিরের অভ্যন্তরীণ ধারণা অনুযায়ী, ১৫০টি আসন পেলে রাজ্যে দলটির অবস্থান একদম সুসংহত হবে এবং এর পর তৃণমূল কংগ্রেস এমনিতেই ‘ভেঙে পড়বে’।

উত্তরবঙ্গে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রেখে বিজেপি এবার তৃণমূলের একক আধিপত্যের জায়গা দক্ষিণবঙ্গে কতটা প্রবেশ করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এ ছাড়া দলটির শীর্ষ জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি কোণায় ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন।

কংগ্রেস, বাম ও অন্যান্য শক্তির প্রভাব

২০২১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এবং সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন বামপন্থিরা জোটবদ্ধভাবে লড়াই করেও একটি আসনও পায়নি।

তবে এবার কংগ্রেস একাই লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটির আশা, মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর এই তিনটি মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্ত জেলায় তারা কিছু আসন পাবে। রাহুল গান্ধী এই রাজ্যে একাধিক জনসভা করেছেন এবং এর মাধ্যমে দলটি মুসলিম সম্প্রদায়ের সামনে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যারা এ যাবৎ তৃণমূলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে।

অন্যদিকে ২০১১ সালে মমতার কাছে ক্ষমতা হারানোর আগে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে রাজ্য শাসন করা সিপিআই (এম)-ও নিজেদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা করেছে। এবার বামপন্থিরা ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’ (আইএসএফ)-এর সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

দলে এক বড় ধরনের প্রজন্মের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সিপিআই (এম) এবার রাজ্যজুড়ে একঝাঁক তরুণ ও প্রগতিশীল নেতাকে প্রার্থী করেছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কলতান দাশগুপ্ত, দীপ্সিতা ধর, ময়ূখ বিশ্বাস ও আফরিন বেগম।

এছাড়া ছোট দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিদায়ী বিধানসভায় বিজেপির বাইরে একমাত্র অ-বিজেপি বিরোধী বিধায়ক ছিলেন আইএসএফ প্রধান নওশাদ সিদ্দিকী। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় আসন থেকে জিতেছিলেন। এবার আইএসএফ ভাঙড় ছাড়াও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত আসনে নিজেদের ভিত মজবুত করার চেষ্টা করছে।

এর বাইরেও তৃণমূল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীর গত বছরের ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে একটি স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে আলোচনায় এসেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) নামে নিজস্ব দল গঠন করেছেন এবং বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছেন। আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল এআইএমআইএম-ও এবার পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

এই ছোট দলগুলো যদি তৃণমূলের মুসলিম ভোটে সামান্যতমও ভাগ বসাতে পারে, তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়া আসনগুলোতে তৃণমূলের জয়ের সম্ভাবনা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস