বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, প্রায় ছয় মাইল ব্যাসের চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরকে (গ্রহাণু) জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শ্রেণিভুক্ত করেছেন ছোট গ্রহাণু হিসেবে। এতে অবশ্য খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এর চেয়েও বহুগুণ বড় গ্রহাণুর অবাধ বিচরণ রয়েছে আমাদের সৌরজগতের গহিনে।
সৌভাগ্যক্রমে এগুলোর বেশিরভাগ কখনো পৃথিবীর ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না। তবে ছোট বা মাঝারি আকারের কিছু কিছু পাথরখণ্ড পৃথিবীর কক্ষপথকে ভেদ করে চলে যায়। অর্থাৎ গ্রহাণুর সঙ্গে ভয়ংকর সংঘর্ষের বিষয়টি নিছক যদি-কিন্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ৬৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে যেকোনো মুহূর্তেই আকাশ থেকে নেমে আসতে পারে মহাবিপর্যয়!
আচ্ছা বলুন তো, এসব গ্রহাণুর আদি নিবাস কোথায়? এগুলোর জন্মই-বা হলো কেমন করে? সূর্যকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া বেশিরভাগ গ্রহাণুর ঠিকানা মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে থাকা বিস্তীর্ণ শূন্যস্থান। সৌরজগতের এই অংশের নাম দেওয়া হয়েছে অ্যাস্টেরয়েড বেল্ট বা গ্রহাণুপুঞ্জ। পৃথিবী থেকে এর গড় দূরত্ব ১৮৫-২৮০ মিলিয়ন মাইল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমান, ছোট-বড় মিলিয়ে এটি সম্ভবত বিলিয়নেরও বেশি সদস্যের এক পরিবার।
প্রায় ৬০০ মাইল ব্যাসের পাথরখণ্ড সেরেস। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিশালাকার বস্তুটির নাম সেরেস। প্রায় ৬০০ মাইল ব্যাসের পাথরখণ্ডটিকে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৮০১ সালের ১ জানুয়ারি খুঁজে বের করেছিলেন বিখ্যাত ইতালীয় জ্যোতির্বিদ জুসেপ্পে পিয়াজ্জি।
সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক মহলে একটি কথা জোরেশোরে প্রচলিত ছিল। মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যকার ফাঁকা অঞ্চলে খুব সম্ভবত লুকিয়ে রয়েছে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এই অজানা বস্তুটির খোঁজে সবাই একরকম হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন। ইউরোপের শীর্ষ ২৪ জন জ্যোতির্বিদ মিলে গঠিত হয়েছিল এক বিশেষ দল, যা পরে সেলেস্টিয়াল পুলিশ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
মাথার ওপরের আকাশকে দলটি বেশ কিছু অংশে ভাগ করে নেয়। প্রতিটি ভাগে নজরদারির দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় একেকজনের ওপর। তাঁদেরই একজন ছিলেন পিয়াজ্জি। সেরেসের হদিস পাওয়ার পর সবাই ভেবেছিলেন, টেলিস্কোপে চোখ রেখে শতসহস্র নির্ঘুম রাত কাটানোর দিন বোধ হয় ফুরিয়েছে। কিন্তু অচিরেই তাঁদের ভুল ভাঙে।
পরবর্তী বছরগুলোতে এটির কাছাকাছি এলাকায় আরও বেশ কিছু একই ধরনের মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত হলে বড় হোঁচট খায় ‘অজানা গ্রহ’ অস্তিত্বের তত্ত্বটি। ইউরেনাস গ্রহের আবিষ্কারক জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেল এই বস্তুগুলোর নামকরণ করেন অ্যাস্টেরয়েড, বাংলায় গ্রহাণু। কেউ কেউ এদের মাইনর প্ল্যানেট নামে ডাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর দেওয়া নামটাই টিকে যায়।
গ্রহাণুগুলোর জন্মরহস্য দীর্ঘদিন মানুষের অধরা ছিল। শুরুতে এগুলোকে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে অবস্থিত সুদূর অতীতে ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো গ্রহের ধ্বংসাবশেষ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে গ্রহবিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যাবধি এই বিশেষ অঞ্চলে কোনো গ্রহই গঠিত হতে পারেনি।
চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। কিন্তু সব আয়োজন ভণ্ডুল করে দিয়েছে পার্শ্ববর্তী গ্যাসদানব গ্রহ বৃহস্পতি। এর অমিত শক্তিশালী মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সেখানকার পাথরখণ্ড তথা গ্রহাণুর গতিবেগ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। ফলে ধীরগতিতে কাছে এসে পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লেগে গ্রহের মতো অতিকায় স্থাপনা সৃষ্টির পরিবর্তে এগুলো একে অন্যের থেকে ছিটকে দূরে সরে যায়।
বৃহস্পতির এহেন অযাচিত হস্তক্ষেপ শুধু নতুন গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর কারণে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীও নিজের পূর্ণ সক্ষমতায় বিকশিত হতে পারেনি। প্রাপ্য কাঁচামালের (পাথরখণ্ড) একটি বড় অংশ সে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলের বর্তমান ভর পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম। অথচ হওয়ার কথা ছিল ঠিক উল্টোটা!
যাহোক, ফিরে আসি গ্রহাণুর প্রসঙ্গে। মেইন বেল্টের বেশিরভাগ সদস্য সূর্যকে কেন্দ্র করে পথ চলে। তবে অপ্রত্যাশিত মহাকর্ষ বলসহ নানা প্রাকৃতিক উপায়ে কালের পরিক্রমায় কিছু কিছু গ্রহাণুর কক্ষপথের আকৃতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। এগুলোর গতিপথ যতই উপবৃত্তাকার হয়, ততই মেইন বেল্টের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের বিস্তৃত অঞ্চলে পরিভ্রমণের সুযোগ বাড়তে থাকে। এমন বস্তুরা মঙ্গল তো বটেই, অনায়াসে চলে আসতে পারে পৃথিবীর দোরগোড়ায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এদেরকে মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। নিয়ার আর্থ অবজেক্ট এবং পোটেনশিয়ালি হ্যাজার্ডাস অবজেক্ট। কোনো গ্রহাণু যদি পৃথিবীর ০.৩ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বের মধ্যে চলে আসে, তাহলে সেটিকে প্রথম দলের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তখন আকার নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় দলে স্থান পেতে গেলে আসতে হবে পৃথিবীর আরও কাছে, ৪.৬ মিলিয়ন মাইল দূরত্বে। পাশাপাশি ন্যূনতম আকার হতে হবে ১৪০ মিটারের বেশি। এর চেয়ে ছোট আকারের বস্তুগুলোর বেলায় পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষ হলেও তেমন বিপদ ঘটার আশঙ্কা থাকে না।
নিচের ছবিতে কয়েক ধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্টের কক্ষপথ উপস্থাপন করা হয়েছে, একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। কয়েক ধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্ট। শুরুতে আছে অ্যামোরস। এটি এমন একধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্ট, যাদের পথচলা পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে, কিন্তু মঙ্গলের কক্ষপথের ভেতরে। ১৯৩২ সালে বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইউজিন জোসেফ ডেলপোর্টের আবিষ্কার করা গ্রহাণু ‘১২২১ অ্যামোর’ অনুসারে এই শ্রেণির নামকরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়তে আছে অ্যাপোলোস। পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রমকারী এমন একধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্ট, যাদের সেমি-মেজর অ্যাক্সিস পৃথিবীর চেয়ে বড়। ১৯৩২ সালে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল রাইনমুথের আবিষ্কৃত গ্রহাণু ‘১৮৬২ অ্যাপোলো’ অনুসারে এই শ্রেণির বস্তুদের নামকরণ করা হয়েছে। তৃতীয়তে আছে এটেনস। এটি পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রমকারী এমন একধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্ট, যাদের সেমি-মেজর অ্যাক্সিস পৃথিবীর চেয়ে ছোট। এই শ্রেণির প্রথম সদস্য ‘২০৬২ এটেন’ আবিষ্কার করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এলিনর হেলিন। সবশেষে আছে আতিরাস। এটি এমন একধরনের নিয়ার আর্থ অবজেক্ট, যাদের পথচলা সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর কক্ষপথের ভেতরে। এই শ্রেণির প্রথম সদস্য ‘১৬৩৬৯৩ আতিরা’ খুঁজে পাওয়া যায় ২০০৩ সালে, লিনিয়ার প্রকল্পের মাধ্যমে। ছবি থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে পৃথিবী ও এর নিকটবর্তী হওয়া গ্রহাণুগুলোর কোনো না কোনো সদস্যের পথ চলতে চলতে এক বিন্দুতে দেখা হয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। ঠিক এই আশঙ্কা মাথায় রেখেই উন্নত দেশগুলো পূর্বসতর্কতা হিসেবে আমাদের আশপাশে বিচরণ করা সব নিয়ার আর্থ অবজেক্টের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরির কাজ শুরু করেছিল সেই আশির দশকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় অবস্থিত একটি ৩৫ ইঞ্চি টেলিস্কোপ দিয়ে শুরু হওয়া বিশাল কর্মযজ্ঞটি কয়েক যুগ পরও সমানতালে চলমান। তবে সুপারকম্পিউটারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে কাজটি আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে। অবলোহিত রশ্মি শনাক্তে সক্ষম এমন সেন্সর ব্যবহারে টেলিস্কোপ দিয়ে বর্তমানে অন্ধকার বা কালো রঙের গ্রহাণুদেরও তাপীয় সংকেত বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুঁজে বের করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে অবজারভেটরি থেকে প্রতি রাতে পাওয়া পাহাড়সম তথ্য বিশ্লেষণে এখন আর মাথার চুল ছিঁড়তে হয় না জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের! এই কাজে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এরা নিজে থেকেই স্থির (আপেক্ষিকভাবে) নক্ষত্র ও গতিশীল গ্রহাণুর মাঝে পার্থক্য চিহ্নিত করে সেকেন্ডের ব্যবধানে ম্যাপিং করতে সক্ষম। এ ছাড়া উন্নত রাডার সিস্টেমের বদৌলতে গ্রহাণুদের আকার, আকৃতি, গতিবেগ পরীক্ষাগারে বসেই নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা যাচ্ছে। তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন মাইল দূরে গতিশীল থাকা বস্তুদের থ্রিডি মডেলও!
নিয়ার আর্থ অবজেক্টদের তথ্যভান্ডার তৈরির প্রজেক্টটি মূলত একটি যৌথ আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। এর নেতৃত্বে রয়েছে নাসার প্ল্যানেটারি ডিফেন্স কো-অর্ডিনেশন অফিস এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি। প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর আশপাশে নির্ধারিত সীমার মাঝে ঘুরে বেড়ানো ১ কিলোমিটারের বেশি বড় সব মহাজাগতিক বস্তু চিহ্নিত করা। বলতে গেলে এই কাজ মোটামুটি শেষের দিকে।
ইতোমধ্যে খুঁজে পাওয়া এমন প্রায় ৯০০টি বস্তু শতাংশের বিচারে আনুমানিক নব্বই ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০০৫ সাল থেকেই জ্যোতির্বিদদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যম আকারের (ব্যাস কমপক্ষে ১৪০ মিটার) নিয়ার আর্থ অবজেক্টগুলো। তাঁদের অনুমান, এই শ্রেণির সদস্যসংখ্যা হতে পারে ২৫ হাজারের বেশি। এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম, প্রায় ১১ হাজার বস্তুকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আগামী শতবর্ষের মাঝে পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতুর খোঁজ অদ্যাবধি মেলেনি।
২০২৮ সাল নাগাদ নিও সার্ভেয়ার মিশনের আওতায় একটি ইনফ্রারেড স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উজ্জ্বল ও অন্ধকার—উভয় ধরনের গ্রহাণু শনাক্তের উপযোগী করে সেটি তৈরি করা হচ্ছে। যদি ঠিকঠাক কাজ করে, তাহলে পাঁচ বছরের মাঝেই মধ্যম আকারের এনইওদের প্রায় নব্বই শতাংশ ম্যাপিং করে ফেলতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বেশ আশাবাদী।
ভালো কথা, ১৪০ মিটারের কম আকারের গ্রহাণুদের নিয়ে বিজ্ঞানীরা একদমই মাথা ঘামান না, বিষয়টি এমন নয়। পরিস্থিতি বরং উল্টো। বিগত সাড়ে চার দশক ধরে খুঁজে বের করা মোট ৪১ হাজার নিয়ার আর্থ অবজেক্টের মধ্যে এদের উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি। সংখ্যাটা প্রায় ৩০ হাজার!
এতে অবশ্য আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর তোলার খুব বেশি অবকাশ নেই। কারণ, সম্ভবত এদের মিলিয়নখানেক সদস্য এখনো অনাবিষ্কৃত। পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে এরাও সীমিত পরিসরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। তবে আকার যদি একদমই ছোট হয়, যেমন কয়েক মিটার, তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এগুলোর ভবলীলা সাঙ্গ করে দেওয়ার জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলই যথেষ্ট।
চলবে...
ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে
টীকা: ১. ২০০৬ সালে সেরেসকে বামন গ্রহের মর্যাদা দেওয়া হয়। ২. মঙ্গলের ভর পৃথিবীর মাত্র এক-দশমাংশ। ৩. অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট সমান ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল বা ১৪ কোটি ৯৬ লাখ কিলোমিটার প্রায়।



