ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর কেবল বোমাবর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পরিণত হয়েছে এক চরম অস্থির ও ব্যয়বহুল ইচ্ছাশক্তির লড়াইয়ে। ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থাই এখন দুই দেশের সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হলেও, কোনও পক্ষই তাদের অবস্থানে ছাড় দিতে রাজি নয়।
সংঘাতের নতুন রূপ
সংঘাতের এই নতুন রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৃহস্পতিবার সকালে। ওই দিন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এক্স -এ লিখেছিলেন, তাদের যোদ্ধারা হরমুজ প্রণালির কাছে সমুদ্রগুহায় লুকিয়ে থেকে ‘আক্রমণকারীদের ধ্বংস করার’ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর ঠিক ১৮ মিনিট পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, ‘আমি মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি হরমুজ প্রণালির পানিতে মাইন বসাতে আসা যেকোনও নৌকা দেখামাত্র গুলি করে ধ্বংস করতে।’
সামরিক স্থবিরতা ও উভয় পক্ষের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কষ্টের মুখে কূটনৈতিক আলোচনাই এখন সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে যৌক্তিক পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে হরমুজ প্রণালির এই অস্থিরতা যে কোনও মুহূর্তে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি ও অর্থনৈতিক সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি চললেও উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অথচ, নেপথ্যে বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট এবং ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি মনে করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার মতো কৌশলগত ও অর্থনৈতিক খরচ বিবেচনায় কোনও কূটনৈতিক চুক্তি দ্রুতই সংকট সমাধান করবে। কিন্তু এখন তিনি তার প্রত্যাশা পুনর্বিবেচনা করছেন। ম্যালোনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা পর্যন্ত ট্রাম্প এই সংকটের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্র যে দ্রুত এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে, তা বেশ বিস্ময়কর।’ ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, এই অচলাবস্থায় তার হাতে ‘বিশ্বের সব সময় আছে, কিন্তু ইরানের নেই’। তিনি একজন কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ভাষ্যকার মার্ক এ. থিয়েসেনের একটি কলাম প্রচার করেছেন, যেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে ট্রাম্পের উচিত ইরানকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়ে এরপর শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়া। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘যদি তারা চুক্তি করতে না চায়, তবে আমি সামরিকভাবে এর সমাপ্তি টানব।’
সামরিক সমাধানের ঝুঁকি
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সামরিক সমাধানের পথটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রেসিডেন্ট সেথ জি. জোনস মনে করেন, আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। বলপ্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব হলেও, এতে বড় আকারের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়া কিংবা মার্কিন মেরিন বা সেনা সদস্যদের দ্বীপ বা উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থেকে যায়।
সেথ জোনসের মতে, এটি এখন একটি ‘গেম অব চিকেন’ বা স্নায়ুযুদ্ধের মতো অবস্থা। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় স্থানেই সামরিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতাদের বলছেন যে, ‘সামরিক উপায়ে দীর্ঘস্থায়ী কোনও সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ ইরান সরকার মনে করে, তাদের অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে বেশি। পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে তারা ছাড় আদায়ে বদ্ধপরিকর। বুধবার ইরান একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় তাদের রেভল্যুশনারি গার্ড হরমুজের কাছে দুটি কার্গো জাহাজ জব্দ করছে। এর জবাবে বৃহস্পতিবার মার্কিন সামরিক বাহিনীও একটি নাটকীয় ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় হেলিকপ্টার থেকে রশি বেয়ে নৌবাহিনীর সদস্যরা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে নামছেন।
বৈশ্বিক প্রভাব ও উদ্বেগ
অন্যদিকে, ট্রাম্প এখনও তেলের দাম কমার জন্য আমেরিকানদের ‘কিছুটা সময়’ অপেক্ষা করতে বলছেন, যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে বলেছেন, এই সংকট দিন দিন বাড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এটি যত দীর্ঘায়িত হবে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে আমাদের তত বেশি সময় প্রয়োজন হবে।’
ইউরেশিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান ক্লিফ কুপচান মনে করেন, বাজার এখনও এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন এক অচেনা জগতে করেছি, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাজার সংশ্লিষ্টদের ভালোভাবে বুঝতে হবে।’



