দুই মাস পর ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোববার দিবাগত রাতে শুরু হওয়া এই হামলা সোমবার সকালেও অব্যাহত ছিল। পরে ইরান হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেয়, তবে লেবানন বা ইরানে আবার হামলা হলে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নিতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'তারা (ইরান ও তার মিত্ররা) আমাদের ওপর আবার হামলা চালালে কঠোর জবাব দেব। কারণ, আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের রয়েছে।' টানা কয়েক দিন হামলা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে তেল আবিব ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলো সোমবার এ খবর জানিয়েছে। তার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান ও ইসরায়েল আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছতে চায়।
ইরানের হামলা ও জবাব
রোববার রাতে হামলার বিষয়ে ইরান বলেছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। তার জবাবে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইসরায়েলে। ইরানের সমর্থনে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীও ইসরায়েলের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইরানের হামলার পর দেশটির রাজধানী তেহরান, ইসফাহান ও তাবরিজ শহরে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
আন্তর্জাতিক প্রভাব
পাল্টাপাল্টি হামলায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৭ ডলারে পৌঁছায়। যুদ্ধের মধ্যে এপ্রিলে তা ১২০ ডলারেও উঠেছিল। যুদ্ধের আগে তা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে। এর ৪০ দিনের মাথায় ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়া শেষ হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠকের চেষ্টা চলছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার এক এক্স পোস্টে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এখন সমঝোতার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ অবস্থায় সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞের মতামত
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ডেভিড উডস আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পরেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ইসরায়েল-লেবাননের যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে পড়েনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এরপর লেবাননে অর্থপূর্ণভাবে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে এই সংকট ভবিষ্যতে আবারও আঞ্চলিক সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ হয়ে না ওঠে।
ইরানের হুঁশিয়ারি
ইরানের যৌথ সামরিক অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়ার বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানায়, তারা ইসরায়েলকে 'যন্ত্রণাদায়ক' জবাব দেওয়ার পর সামরিক অভিযান স্থগিত করেছে। তবে ইসরায়েল যদি আবার ইরান বা লেবাননে হামলা চালায়, তাহলে তার জবাব হবে আগের চেয়ে তীব্র ও ধ্বংসাত্মক। সোমবার এক বিবৃতিতে খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর জানায়, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েল 'নৃশংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড' চালিয়েছে। এতে তারা 'অপরাধী আমেরিকার' সমর্থন পেয়েছে। তার জবাব হিসেবে ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েলে হামলা চালায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায়, 'ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দায় স্পষ্ট। উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।' ইসরায়েলের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও একই কথা বলেছেন। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা জাতীয় শক্তির দুটি দিক। তেহরান কোনোটাই ছাড়েনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ইসরায়েল ও ইরান উভয়ে সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছে। তারা চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে চায়। অজ্ঞতা বা নির্বুদ্ধিতা বাধা হয়ে না দাঁড়ালে বলা যায়, শান্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। ইরানের বন্দরে নিজেদের অবরোধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প লেখেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল ও পুরোপুরি কার্যকর থাকবে। তবে বিষয়গুলো দ্রুত এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, ট্রাম্পের এই পোস্টের আগে তাঁর সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কথা হয়।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের দপ্তর সোমবার এক্সে জানায়, ১৭ এপ্রিল থেকে ৭ জুন পর্যন্ত লেবাননে ৩ হাজার ৪৯১টি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। একই সময়ে ৪০৭টি ধ্বংস অভিযান ও ছয়টি গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার মতো অভিযান চালিয়েছে দেশটি। ২ মার্চ থেকে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের হামলায় ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একই সঙ্গে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তথা ২ হাজার বর্গকিলোমিটার দখল করেছেন ইসরায়েলের সেনারা। যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে প্রায় ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
গাজায় হামলা অব্যাহত
আল-জাজিরা জানায়, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ হালনাগাদে জানায়, সোমবার বিকেল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় উপত্যকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৯টি মৃতদেহ ও ৪৩ জন আহত ব্যক্তিকে আনা হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে সেখানে ইসরায়েলের হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭২ হাজার ৯৮০ জন হয়েছে। একই সময়ে গাজায় আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ মানুষ।



