উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চলতি বছরের প্রথম বিদেশ সফরে পিয়ংইয়ং পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বিস্তারের ঘোর বিরোধী পারমাণবিক অস্ত্রধারী ও বিচ্ছিন্ন দেশ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বেইজিংয়ের দ্বিপাক্ষিক বন্ধন দৃঢ় করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য।
সফরের তাৎপর্য
শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানান, দীর্ঘ সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের দুই দিনের এই সফরটিকে দুই দেশই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের বৃহত্তর উন্নয়নে একটি বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির জেরে রুশ ও উত্তর কোরিয়ার সেনারা একসঙ্গে লড়াই করছে। ২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘ ২৪ বছর পর পিয়ংইয়ং সফর করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক আলেজান্দ্রো রেইস বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন হলো রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার গভীর সম্পর্ক। কিম জং উন এখন এক দশক আগের চেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বেশি স্বাধীন। শি জিনপিংয়ের এই সফর মূলত কিমকে এটিই মনে করিয়ে দেওয়া যে, রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারলেও চীনই উত্তর কোরিয়ার অপরিহার্য প্রতিবেশী। তবে রাশিয়ার কারণে বেইজিং অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন, এমনটি ভাবাও ভুল হবে। রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার বিকল্প বাড়াতে পারলেও চীনের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের বিকল্প হতে পারবে না।
অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা
বেইজিংয়ের ওপর পিয়ংইয়ংয়ের অতিনির্ভরশীলতা বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন ও দরিদ্র দেশ উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব কোরিয়া’র ২০২৫ সালের আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার জিডিপি ছিল ২৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার (যা আগের বছরের চেয়ে ৩.৭ শতাংশ বেশি)। এর বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অভাবনীয় উন্নতি করে ১.৮৮ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপিতে পৌঁছেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় থাকা উত্তর কোরিয়ার বৈশ্বিক বাণিজ্যের ‘প্রায় ৯৫ শতাংশই’ সম্পন্ন হয় চীনের সঙ্গে, যার আর্থিক মূল্য ২.৭৪ বিলিয়ন ডলার। চীন মূলত পেট্রোলিয়াম, খাদ্য, বস্ত্র ও যন্ত্রপাতি রফতানি করে এবং উত্তর কোরিয়া থেকে কৃত্রিম চোখের পাপড়ি, পরচুলা, লোহা, ইস্পাত ও হিমায়িত মাছ আমদানি করে। এ ছাড়া বহু উত্তর কোরিয়ান চীনের মৎস্য ও নির্মাণ খাতে কাজ করেন।
সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লো বলেন, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘকাল ধরে চীনকে অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে ব্যবহার করছে। বাণিজ্য ছাড়াও বেইজিংয়ের কারণে পিয়ংইয়ং আন্তর্জাতিক বৈধতা ও সুরক্ষা পায়। চীন মূলত উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদানকারী।
অধ্যাপক রেইস বলেন, পুতিন হয়তো অস্ত্র প্রযুক্তি বা কূটনৈতিক সমর্থন দিতে পারেন, কিন্তু বেইজিং দেয় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক লাইফলাইন। উপরন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীনই পিয়ংইয়ংকে বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
চীনের কেন উত্তর কোরিয়াকে প্রয়োজন?
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ২০২৪ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন মূলত কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উত্তর কোরিয়াকে পাশে চায়। শি জিনপিংয়ের প্রধান লক্ষ্য হলো কিম সরকারের পতন ঠেকানো এবং এই অঞ্চলে যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ এড়ানো, যা চীনের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থকে বিঘ্নিত করতে পারে।
ডিলান লো-র মতে, উত্তর কোরিয়া মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি কোরিয়া যুদ্ধের ঐতিহাসিক যৌথ স্মৃতি ও দুই দেশের কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিশালী সম্পর্ক তো রয়েছেই।
ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক নাটিক্সিস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো বলেন, চীন উত্তর কোরিয়াকে মিত্র হিসেবে নয়, কৌশলগত ঢাল হিসেবে চায়। এটি মার্কিন সেনাদের চীনের সীমান্ত থেকে দূরে রাখে এবং কিম সরকারের বিশৃঙ্খল পতন রোধ করে, যা ঘটলে লাখ লাখ শরণার্থী চীনে প্রবেশ করত এবং এশিয়ায় ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়ত।
নিয়ন্ত্রণ পুনরুত্থাপন
অর্থনীতিবিদ হেরেরো জোর দিয়ে বলেন, শি জিনপিংয়ের এই সফর মূলত কৌশলগত ক্ষমতার রাজনীতি। উত্তর কোরিয়া যাতে রাশিয়ার দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি কিমের সঙ্গে কোনও চুক্তি করার চেষ্টা করেন, তবে চীন যাতে তার মূল নিয়ন্ত্রক থাকতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই শি-র এই প্রয়াস। শি সাধারণত চীন ছেড়ে বাইরে যান না। মার্কিন ও রুশ চাপের মুখে বেইজিং যে তার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত করছে, এই সফর তারই প্রমাণ।
অধ্যাপক রেইস আরও জানান, সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালকৃষ্ণানের পিয়ংইয়ং সফর ঘিরে গুঞ্জন চলছে যে, আঞ্চলিক পক্ষগুলো উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততার আগ্রহ গোপনে খতিয়ে দেখছে। এর বাইরে ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধও কিমকে মার্কিন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া এড়িয়ে যোগাযোগ মাধ্যমগুলো খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। ফলে শি জিনপিংয়ের এই সফর কেবল রাশিয়া বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং পারমাণবিক প্রতিরোধে আত্মবিশ্বাসী এবং মস্কোর সঙ্গে যুক্ত এক নতুন উত্তর কোরিয়ার আঞ্চলিক সমীকরণে চীনকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।
সূত্র: আল জাজিরা



