আমাজন নদী বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, যা পানি পরিমাণ ও অববাহিকা উভয় দিক থেকেই অনন্য। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীও হতে পারে, তবে এই তকমা নির্ভর করে এর প্রকৃত উৎস কোথায় তা নির্ধারণের ওপর। নদীর উৎস খুঁজে বের করা বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত একটি বিষয়।
আমাজনের দৈর্ঘ্য ও উৎসের বিতর্ক
প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ পেরিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। তবে আমাজন নদী সব সময় এমন ছিল না। ২০০৬ সালে ভূতত্ত্ববিদ রাসেল ম্যাপস, যিনি তখন স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র, আন্দিজ থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত নদীর পলিমাটির গতিপথ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি মাটির নিচে ‘জিরকন’ নামের প্রাচীন রত্নপাথরের ক্ষুদ্র খণ্ড আবিষ্কার করেন, যা সেখানে থাকার কথা ছিল না।
জিরকন পাথরের সাক্ষ্য
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, এই প্রাচীন পাথরের স্তরগুলো আন্দিজ পর্বতমালা থেকে আসেনি, বরং পূর্ব দিকের কোনো অঞ্চল থেকে এসেছে। এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর ইতিহাসের কোনো এক সময়ে আমাজন নদী এখনকার উল্টো দিকে, অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হতো। এই দাবির পক্ষে আরও প্রমাণ মেলে যখন ওই অঞ্চলে সামুদ্রিক প্রাণীর প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া যায়। আমাজন নদী অতীতে গতিপথ না বদলালে সমুদ্রের প্রাণীরা মহাদেশের ভেতরে পৌঁছাতে পারত না।
গতিপথ পরিবর্তনের কারণ
বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেন। প্রথম দলের মতে, আন্দিজ পর্বতমালা তৈরি হওয়ার আগে এই অঞ্চলের মাটির ঢাল ছিল উল্টো। নদীটি পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমের পুরুস আর্চ নামক প্রাচীন পাহাড়ি এলাকার দিকে বয়ে যেত এবং পানি পড়ত প্রশান্ত মহাসাগরে। সময়ের সঙ্গে উত্তর পূর্ব দিকের পাহাড় ক্ষয়ে নিচু হতে থাকে এবং আমাজনের প্রবাহের দিক ওলটাতে শুরু করে। আন্দিজ পর্বতমালা উঁচু হওয়া ও পুরুস আর্চের উপস্থিতির কারণে মাঝখানে এক বিশাল নিচু অববাহিকা সৃষ্টি হয়, যা পানিতে ভরে হ্রদে পরিণত হয়। একপর্যায়ে পানি উপচে পূর্ব দিকে বইতে শুরু করে, যা আজকের পূর্বমুখী আমাজন নদীর জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় তত্ত্ব: আন্দিজের প্রভাব
অন্যদিকে ২০১৪ সালে বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল বিকল্প ধারণা দেন। তাঁদের মতে, আন্দিজ পর্বতমালা ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে বাতাস থেকে মেঘ আটকে দেয়, ফলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয় এবং পেবাস জলাভূমি নামে এক বিশাল জলাশয় তৈরি হয়। বছর ধরে পলিমাটি জমে পানির প্রবাহ পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে যায়।
বিতর্ক ও ঐক্যমত্য
আমাজন নদী কেন পথ বদলেছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও তাঁরা একমত যে এই ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় এক কোটি বছর আগে।
উৎসের জটিলতা
আমাজন নদীর সুনির্দিষ্ট কোনো একক উৎস নেই; এক হাজারের বেশি উপনদীর পানি মিলে এটি গঠিত। উৎস চিহ্নিত করতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংজ্ঞা ও নিয়ম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, উৎসকে দুইভাবে দেখা হয়: প্রধান উৎস (সবচেয়ে বেশি পানি সরবরাহকারী) ও সবচেয়ে দূরবর্তী উৎস (দীর্ঘতম পথ)।
উৎসের বিবর্তন
১৭০০ দশকে মারানন নদীকে উৎস ধরা হতো, পরে উচায়ালি নদী দীর্ঘতম শাখা হিসেবে খেতাব পায়। ২০১৪ সালে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে মানতারো নদীকে আসল উৎস দাবি করা হয়, যা নীল নদের চেয়েও দীর্ঘ। তবে মানতারো নদীর সমস্যা হলো, একটি বাঁধের কারণে বছরের পাঁচ মাস এটি শুকিয়ে থাকে। পানিবিদদের মতে, আমাজনের মতো নদীর উৎস বছরের অর্ধেক সময় শুকনো থাকতে পারে না, তাই তাঁরা ১২ মাস পানি প্রবাহের শর্ত যুক্ত করার কথা বলছেন। সব মিলিয়ে মারানন, আপুরিমাক ও মানতারোর মতো প্রধান উপনদীর মিলিত স্রোতই আমাজনের মূল উৎস।



